
ফেরত আসা নাম
মোঃ মিসাদ আলী
এক
রাত অনেক দূর গড়িয়েছে। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে সামান্য চাঁদের আলো বের হওয়ার বৃথা চেষ্টা করছে, কিন্তু সফল হতে পারছে না। চারপাশে এমন এক নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে, যেন পৃথিবী থেকে সমস্ত শব্দ হঠাৎ করেই হারিয়ে গেছে। দূরের জলাভূমি থেকে মাঝেমধ্যে ব্যাঙের ডাক ভেসে আসছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে গভীর অন্ধকারে। বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ, বিকেলের বৃষ্টির পানি এখনও রাস্তার ধারে জমে আছে ছোট ছোট গর্তে।
রফিক একা হাঁটছে। বাজার থেকে ফিরতে বেশ অনেকটা দেরি হয়ে গেছে আজ। এই পথে আজ প্রথম না, বহুবার হেঁটেছে, তবে দিনের আলোতে পথটাকে যতটা সাধারণ মনে হয়, রাতের আঁধারে ঠিক ততটাই অপরিচিত লাগে। রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোকে দেখে মনে হয়, তারা যেন বহুদিন ধরে কোনো অজানা ঘটনার সাক্ষী হয়ে নীরবে অপেক্ষা করছে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার পা থেমে গেল, কয়েক গজ সামনে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে বিষয়টাকে স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল। এই গ্রামে রাত জেগে চলাফেরা করা মানুষের অভাব নেই। কিন্তু লোকটার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা রফিককে অস্বস্তিতে ফেলে দিল। সে নড়ছে না, কোনো কথা বলছে না, শুধু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার মধ্যখানে।
রফিক চোখ কুঁচকে তাকাল। আলো কম হলেও মুখটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করল। সেটা দেখে তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। এ মুখ সে ভুলতে পারেনি। বহু বছর আগের চাপা পড়ে থাকা একটি নাম, একটি স্মৃতি, একটি ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এলো।
-শরিফ!’ নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলো একটি নাম। নামটা তার শৈশবের বন্ধুর। যার কথা সে বহু বছর ধরে মনে করতে চায়নি।
রফিকের গলা শুকিয়ে এলো। শরীরের ভেতর দিয়ে শীতল একটা স্রোত বয়ে গেল। সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, হয়তো ভুল দেখছে। হয়তো অন্ধকারের কারণে অন্য কাউকে শরিফ মনে হচ্ছে। কিন্তু যতই তাকাচ্ছিল, ততই তার বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছিল যে ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
লোকটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখদুটো অস্বাভাবিক স্থির, সেই চোখে জীবনের কোনো উষ্ণতা নেই। নেই কোনো পরিচিত মানুষের স্বাভাবিক অভিব্যক্তিও।
কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল, তারপর আচমকা লোকটি দৌড়াতে শুরু করল। রফিক প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। তার মস্তিষ্ক যেন পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। সবকিছু এত দ্রুত ঘটছিল যে প্রতিক্রিয়া জানানোরও সুযোগ পেল না সে।
এক ঝলক ধাতব আলো অন্ধকার ভেদ করে উঠল, পরের মুহূর্তেই তীব্র যন্ত্রণায় তার পুরো শরীরে একটা ঝাঁকি দিলো। গলার গভীরে কিছু একটা ঢুকে গেছে। সে দু’হাত দিয়ে গলা চেপে ধরল, কিন্তু উষ্ণ রক্ত আঙুলের বাধা পেরিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল। পৃথিবীটা হঠাৎ কেমন ঘুরে উঠল তার চোখের সামনে। সে পেছনে সরে যেতে চাইল, কিন্তু পা আর শরীরের কথা শুনল না। ধীরে ধীরে হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে পড়ল।
মৃত্যুর আগে মানুষের মনে নাকি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিগুলো ফিরে আসে। রফিকের ক্ষেত্রেও যেন তাই হলো। বহু বছর আগের সেই রাতটা আবার চোখের সামনে ভেসে উঠল। এমন একটি সত্য, যা সে এতদিন নিজের ভেতর কবর দিয়ে রেখেছিল। এমন একটি অপরাধ, যার কথা সে কখনও কাউকে জানায়নি।
তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছিল, শেষবারের মতো সে মাথা তুলে তাকানোর চেষ্টা করল। রাস্তার মাঝখানে কেউ দাঁড়িয়ে নেই। চারপাশ আবার আগের মতোই নিস্তব্ধ, শুধু বাতাসে গাছের পাতা কাঁপছে। দূরে কোথাও রাতজাগা পাখি ডেকে উঠল।
রফিকের নিথর দেহ রাস্তার ওপর পড়ে রইল। আর তার ডান হাতের কাছেই উল্টে থাকা একটি ছোট্ট কাগজ বাতাসের ঝাপটায় দোল খাচ্ছে। সাদা কাগজটিতে মাত্র একটি শব্দ লেখা ছিল “শরিফ”।
দুই
চট্টগ্রাম থেকে ফেরার পথে রাত আরও গভীর হয়ে উঠেছে। অন্ধকার রাস্তা পেরিয়ে তাদের গাড়ি নদীর ওপর নির্মিত দীর্ঘ সেতুটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, চারপাশে এক নির্জনতা নেমে এসেছে, যেন পৃথিবীতে আর কোনো মানুষ নেই। দূরে দূরে জেলেদের নৌকায় জ্বলতে থাকা ক্ষীণ আলো নদীর কালো জলে কাঁপছে। আকাশে মেঘ জমেছিল ভারী হয়ে। মাঝে মাঝে বাতাস এসে ব্রিজের লোহার ল্যাম্পপোষ্টে আঘাত করে সৃষ্টি করছে অদ্ভুত এক গুঞ্জন।
গাড়ির ভেতরে শাহিন, আসিফ ও করিমের হাসি-ঠাট্টা অনেকক্ষণ আগেই থেমে গেছে। সারাদিনের ভ্রমণের ক্লান্তি তাদের কণ্ঠকে ভারী করে তুলেছে। করিম স্টিয়ারিং ধরে আছে, আর বাকি দুজন আধো ঘুমে জানালার বাইরে তাকিয়ে উপভোগ করে ঘুমের ঘোর কাটানোর চেষ্টা করছে।
হঠাৎ করেই করিমের শরীর শক্ত হয়ে গেল। ব্রিজের মাঝামাঝি স্থানে, হেডলাইটের আলোয় একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। না, ছেলে মানুষ নয়। একটি মেয়ে, সাদা পোশাক পরা। ভেজা চুল কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে। সে নড়ছে না, শুধু দাঁড়িয়ে আছে।
করিম প্রথমে হর্ন দিল। মেয়েটি সরল না। আরও কাছে আসতেই গাড়ির ভেতরের তিনজনের মুখের রঙ পাল্টে গেল। কারণ মেয়েটির মুখ তাদের ভিষণ চেনা। অনেক বছর আগের একটি মুখ, একটি না, একটি ঘটনা, একটি রাত। যে রাতের কথা তারা কেউ কখনও উচ্চারণ করেনি। যে সত্যকে তারা মাটি চাপা দিয়ে রেখেছিল নিজেদের ভেতরে।
মেয়েটির ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল। তার চোখদুটো স্থির, অস্বাভাবিক, অভিযোগহীন। তবু সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু আছে, যা তিনজন মানুষের বুকের ভেতরের সবচেয়ে অন্ধকার স্মৃতিগুলোকে একসঙ্গে জাগিয়ে তুলল।
করিমের হাত কাঁপতে শুরু করল। শাহিন চিৎকার করে উঠল। আসিফ সামনে ঝুঁকে এসে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দ বের হলো না। মেয়েটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তাদের সামনে। যেমন করে সেদিন দাঁড়িয়ে ছিল।
করিম হঠাৎ স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিল। একটা বিকট শব্দে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে টায়ার ঘর্ষণের তীক্ষ্ণ আওয়াজ রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ছুটে গেল। পরের মুহূর্তেই ব্রিজের রেলিং ভেঙে গাড়িটি শূন্যে ঝুলে উঠল।
সময় যেন থমকে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপর সবকিছু নিচে পড়ে যেতে শুরু করল। ধাতব শরীর মোচড় খেতে খেতে নদীর কালো পানির দিকে ধেয়ে গেল। প্রচণ্ড আঘাতে পানি বিস্ফোরণের মতো ছিটকে উঠল চারদিকে।
নদী আবার শান্ত হয়ে গেল। শুধু কয়েক মুহূর্ত জলের ওপর ভেসে থাকল বুদবুদ, তারপর সেগুলোও মিলিয়ে গেল। গভীর অন্ধকারের নিচে গাড়িটি ধীরে ধীরে তলিয়ে যেতে লাগল। ভেতরে তখনও তিনজন জীবিত। করিম মরিয়া হয়ে দরজা খুলতে চেষ্টা করছিল, শাহিন জানালায় আঘাত করছিল আর আসিফের মুখ থেকে আতঙ্কে অস্পষ্ট শব্দ বের হচ্ছিল। কিন্তু নদীর পানি দ্রুত ভরে ফেলছিল গাড়ির প্রতিটি ফাঁক। ধীরে ধীরে, নির্দয়ভাবে। যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি তাদের পালানোর প্রতিটি পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।
শেষ মুহূর্তে শাহিন জানালার বাইরে তাকিয়েছিল। আর তখন সে তাকে দেখল, জলের অন্ধকারের মধ্যে। গাড়ির ঠিক বাইরে, সেই মেয়েটি। চুলগুলো পানির ভেতর ভাসছে, চোখদুটো খোলা, স্থির। তার ঠোঁটের কোণে এখনও সেই একই হাসি। তারপর নদীর কালো পানি সবকিছু গ্রাস করে নিল।
পরদিন ভোরে উদ্ধারকারীরা যখন ডুবে যাওয়া গাড়িটি খুঁজে পেল, তখন ভেতরে তিনটি নিথর দেহ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তবু গাড়ির ড্যাশবোর্ডের ওপর একটি ভেজা কাগজ অক্ষত অবস্থায় পড়ে ছিল। কাগজে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লেখা ছিল একটি নাম “সাথী”।
তিন
রাহেলা বেগমের বয়স ষাট ছুঁইছুঁই। গ্রামের মানুষ তাকে সম্মান করে, কেউ কেউ ভয়ও পায়। স্বামী মারা যাওয়ার পর দীর্ঘদিন ধরে তিনি একাই থাকেন পৈতৃক ভিটায়। বাড়িটা বেশ পুরোনো, চারদিকে আম, জাম আর কাঁঠালের গাছ। দিনের বেলায় জায়গাটা যতটা আপন মনে হয়, রাত নামলে ততটাই অপরিচিত লাগে।
আজ রাতেও তিনি যথারীতি ঘুমাতে গেলেন, কিন্তু গভীর রাতে আচমকা তার ঘুম ভেঙে গেল। কেন ভেঙেছে, তা প্রথমে বুঝে উঠতে পারলেন না। চোখ মেলে তিনি অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন, অথচ ঘরের ভেতর সবকিছু তারকাছে স্বাভাবিকই মনে হলো। জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকছে। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছে। দূরে কোথাও একদল কুকুরের ডাকও কানে আসছে।
রাহেলা বেগম ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। বয়স বাড়লেও তার সাহস কমেনি, জীবনে অনেক ঝড় দেখেছেন। কিন্তু হঠাৎ বুকের ভেতর অকারণ একটা চাপ অনুভব করলেন। তার দৃষ্টি গিয়ে থামল ঘরের কোণের দিকের অন্ধকারের মাঝে। কিন্তু সেই অন্ধকারের ভেতর যেন কিছু একটা আছে। না, হয়তো চোখের ভুল। তিনি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। ঠিক তখনই একটা শব্দ হলো।
খস…
যেন কেউ পা টেনে হাঁটছে। শব্দটা এলো ঘরের ভেতর থেকেই। রাহেলা বেগমের গলা শুকিয়ে গেল। তিনি কাঁপা হাতে বাতি জ্বালানোর সুইচের দিকে এগোলেন। ক্লিক…
বাতি জ্বলেনি। আরেকবার চাপলেন। তবু না। হঠাৎ যেন ঘরটা আরও অন্ধকার হয়ে উঠল। আর সেই অন্ধকারের মধ্যে তিনি একজনকে দেখতে পেলেন, দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, নড়ছে না। শুধু তাকিয়ে আছে তার দিকে এক দৃষ্টিতে। রাহেলা বেগমের বুকের ভেতর রক্ত হিম হয়ে গেল, এই মুখ তিনি চিনেন এবং সেটাও খুব ভালো করেই। কারণ বহু বছর আগে শেষবার এই মুখটাই তিনি দেখেছিলেন। সেদিনও রাত ছিল। সেদিনও চারপাশ নীরব ছিল, সেদিনের পর আর কখনও এই মানুষটাকে কেউ দেখেনি।
নাসিম! তার সৎ ছেলে, যে সরকারি কাগজে আজও “নিখোঁজ”। কিন্তু রাহেলা বেগম জানেন, সে নিখোঁজ হয়নি। সে আর কখনও ফিরতে পারেনি। কারণ ফিরতে দেওয়ার সুযোগই তাকে দেওয়া হয়নি। নাসিম ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে শুরু করল। তার পায়ের শব্দ হচ্ছে না, তবু মনে হচ্ছিল প্রতিটি পদক্ষেপ রাহেলা বেগমের বুকের ওপর পড়ছে। তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক স্থির, যেন জীবিত মানুষের চোখ নয়। রাহেলা বেগম পিছিয়ে যেতে লাগলেন, তার ঠোঁট কাঁপছে, তিনি কিছু বলতে চাচ্ছেন, হয়তো ক্ষমা চাইতে কিংবা হয়তো নিজের অপরাধের ব্যাখ্যা দিতে চাইলেন। কিন্তু শব্দ বের হলো না। নাসিম আরও কাছে এলো। এত কাছে যে এখন তার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, মুখের চামড়া বিবর্ণ, ঠোঁট নীলচে, চোখের নিচে গভীর কালো দাগ। যেন দীর্ঘদিন মাটির নিচে শুয়ে থাকার ক্লান্তি এখনও তাকে ছাড়েনি।
রাহেলা বেগম হঠাৎ দৌড়ে দরজার দিকে যেতে চাইলেন। কিন্তু ঠিক তখনই তিনি অনুভব করলেন, কেউ তার গলা চেপে ধরেছে। তিনি দুই হাতে গলা আঁকড়ে ধরলেন, শ্বাস নিতে পারছেন না, তার চোখ বড় বড় হয়ে উঠল। ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। তিনি ছটফট করতে লাগলেন। বিছানার পাশে রাখা টেবিল উল্টে পড়ল। একটা গ্লাস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল মেঝেতে। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ি কিছুটা হেলে উঠলো। কিন্তু তাকে বাঁচানোর মতো কেউ ছিল না। ধীরে ধীরে তার হাতের শক্তি কমে এলো। হাঁটু ভেঙে গেল, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে উঠল। শেষ মুহূর্তে তিনি আবার তাকালেন সামনে। নাসিম দাঁড়িয়ে আছে, একদম স্থির হয়ে, তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি। সেই হাসিতে রাগ নেই, প্রতিশোধের উল্লাসও নেই আছে শুধু এক ধরনের শীতল সমাপ্তি। যেন বহুদিনের একটি হিসাব অবশেষে মিটে গেছে। পরদিন সকালে গ্রামের মানুষ দরজা না খোলায় সন্দেহ করে। অনেক ডাকাডাকির পর দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে তারা। রাহেলা বেগমের নিথর দেহ পড়ে আছে মেঝেতে। চোখ দুটো এখনও বিস্ফারিত, মুখে জমে আছে মৃত্যুর আগের আতঙ্ক। আর তার ডান হাতের পাশে পড়ে ছিল একটি ছোট্ট কাগজ। কাগজটিতে লেখা মাত্র একটি নাম, “নাসিম”।
চার
রায়হান শহরের পরিচিত একজন ব্যবসায়ী। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। অর্থ, পরিচিতি, প্রভাব, কোনোকিছুরই অভাব নাই তার। মানুষ তাকে সফল বলে, সম্মান করে। কিন্তু মানুষের চোখে যে জীবন ধরা পড়ে, তার আড়ালে আরও একটি জীবন থাকে। এমন কিছু অধ্যায় থাকে, যা শুধু অন্যের কাছ থেকে নয়, নিজের কাছ থেকেও লুকিয়ে রাখতে চায়।
রাত প্রায় দুইটা, রায়হান নিজের অফিসে বসেছিল। শহরের প্রায় সব দোকানপাট অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। বহুতল ভবনের কাচঘেরা জানালার বাইরে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য আলোর বিন্দু। দূরের রাস্তা দিয়ে মাঝেমধ্যে দু-একটি গাড়ি চলে যাচ্ছে, আর তাদের হেডলাইটের আলো ক্ষণিকের জন্য আশপাশের ভবনের দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। রাত যত গভীর হচ্ছে, শহর যেন ততই নিস্তব্ধ হয়ে উঠছে। অফিসের ভেতরে শুধু এসির মৃদু গুঞ্জন আর দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দ। বিশাল ফ্লোরজুড়ে আর কেউ নেই। দিনের ব্যস্ততার কোনো চিহ্নও যেন অবশিষ্ট নেই সেখানে। মাঝে মাঝে করিডোরের কোথাও থেকে অস্পষ্ট খটখট শব্দ ভেসে আসছে, মনে হচ্ছে নির্জন ভবনটা নিজেই অন্ধকারের ভেতর ধীরে ধীরে নিশ্বাস নিচ্ছে।
ডেস্কের ওপর ছড়িয়ে থাকা ফাইলগুলো গুছিয়ে রাখলো রায়হান। কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার কথা ভাবছিল সে। ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা একটি খামে। খামটা দেখেই তার হাত থেমে গেল, ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। খামটি যে আগে সেখানে ছিল না, সে ব্যাপারে সে পুরোপুরি নিশ্চিত। কারণ কিছুক্ষণ আগেও ফাইল গুছানোর সময় টেবিলের প্রতিটি জিনিস তার চোখের সামনেই ছিল। তখন সেখানে কোনো খাম ছিল না। অজানা এক অস্বস্তি ধীরে ধীরে বুকের ভেতর জমতে শুরু করল। সে একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিলো, অফিসের কাচের দেয়ালে নিজের প্রতিচ্ছবি ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। প্রধান দরজাটাও ভেতর থেকে বন্ধ। তাহলে খামটা এলো কোথা থেকে?
ধীরে ধীরে খামটি হাতে তুলে নিলো রায়হান। কাগজের সাধারণ একটা খাম হলেও সেটাকে অদ্ভুত রকম ঠান্ডা মনে হলো তার। খামের ভেতরে ছিল একটি মাত্র কাগজ। কাগজটা বের করে চোখ বুলাতেই তার শরীর শক্ত হয়ে গেল। সেখানে লেখা একটি নাম, “হেলাল”। নামটি পড়তেই তার বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ধসে পড়ল। মুখের রঙ মুহূর্তেই বদলে গেল। অনেক বছর ধরে ভুলে থাকার চেষ্টা করা একটি মুখ আবার স্মৃতির অন্ধকার থেকে ধীরে ধীরে উঠে এলো। সেই মুখের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন কিছু ঘটনা, যা সে বহু আগেই নিজের জীবনের গভীরতম অন্ধকারে চাপা দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু কাগজের ওপর লেখা পাঁচটি অক্ষর যেন সেই চাপা পড়া অন্ধকারের দরজাটা আবার নিঃশব্দে খুলে দিল।
হেলাল, তার ব্যবসায়িক অংশীদার। একসময় সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের একজন। সরকারি নথি অনুযায়ী যার মৃত্যু হয়েছিল একটি সড়ক দুর্ঘটনায়। আর সেই নথিতে স্বাক্ষর করা কয়েকজন মানুষের মধ্যে একজন ছিল রায়হান নিজেই। নামটা চোখের সামনে আসতেই বহু বছর আগের চাপা পড়ে থাকা স্মৃতিগুলো যেন একে একে জেগে উঠতে শুরু করল। এমন কিছু স্মৃতি, যেগুলোকে সে এতদিন ধরে মনের সবচেয়ে অন্ধকার জায়গায় বন্দি করে রেখেছিল।
হঠাৎ অফিসের বাতিগুলো একবার মিটমিট করে উঠল। আলো নিভে যায়নি, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো ঘরটাকে অস্বাভাবিক লাগল। রায়হান মাথা তুলে তাকাল, পরক্ষণেই আবার সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। এসির শব্দ আছে, ঘড়ির টিকটিক শব্দ আছে, আলোও জ্বলছে আগের মতোই। কিন্তু তার মনের ভেতরে আর কিছুই স্বাভাবিক নেই। হাতের তালু ঘামে ভিজে উঠেছে, বুকের ভেতর অকারণ এক চাপা অস্বস্তি জমে উঠছে। সে দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবং নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, কেউ হয়তো তার সঙ্গে মজা করছে। হয়তো কেউ তার অতীত সম্পর্কে জেনে তাকে ভয় দেখাতে চাইছে। এর বাইরে আর কিছু হতে পারে না।
কিন্তু ঠিক তখনই তার চোখ গিয়ে আটকে গেল অফিসের কাঁচের দেয়ালে। সেখানে নিজের প্রতিবিম্ব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আর সেই প্রতিবিম্বের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি অবয়ব। একজন মানুষ, অন্ধকারে চাদর থেকে উঁকি দিচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য রায়হানের শরীর যেন অবশ হয়ে গেল। তারপর তড়াক করে ঘুরে দাঁড়াল সে, কিন্তু পেছনে কেউ নেই। বিশাল অফিস ফ্লোরটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। সারি সারি ডেস্ক, নিভু নিভু আলো আর নীরবতা ছাড়া সেখানে আর কিছুই নেই। তবুও সে জানে, কয়েক মুহূর্ত আগে সে যা দেখেছে তা কল্পনা নয়, সে ভুল দেখেনি।
বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ দ্রুত বাড়তে লাগল। মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ডটা যেন পাঁজর ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসবে। চারপাশের নীরবতাও এখন আর স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে অদৃশ্য কেউ একজন দূর থেকে তাকে দেখছে, তার প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ করছে। অফিসের ঠান্ডা বাতাসের মধ্যেও তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। এক ধরনের অদৃশ্য আতঙ্ক ধীরে ধীরে চারপাশ থেকে তাকে ঘিরে ধরছিল।
সে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। ফাইল, কাগজপত্র সব টেবিলের ওপর ফেলে দরজার দিকে এগোল। বুকের ভেতরের অস্বস্তিটা এখন আর উপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। দরজা খুলে করিডোরে বেরিয়েই সে থমকে দাঁড়াল। দীর্ঘ করিডোরের একদম শেষ প্রান্তে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, নিঃশব্দে। করিডোরের বেশ কয়েকটি আলো নষ্ট হয়ে থাকায় শেষ প্রান্তটা আধো অন্ধকারে ডুবে আছে, তাই লোকটার মুখ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। কয়েক সেকেন্ড রায়হান স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর লোকটি ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে এলো। করিডোরের আলো মুখের ওপর পড়তেই রায়হানের শরীরের সমস্ত শক্তি যেন মুহূর্তেই হারিয়ে গেল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে মুখ চিনতে ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হেলাল! একদম সেই চেহারা, সেই চোখ, সেই মুখ, যে মুখ সে শেষ দেখেছিল বহু বছর আগে একটি বিধ্বস্ত গাড়ির ভেতরে, রক্তে ভেজা অবস্থায়।
হেলাল ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল। তার হাঁটার ভঙ্গি স্বাভাবিক নয়। শরীরের কোথাও কোনো তাড়াহুড়োর ইঙ্গিত নেই, তাকে দেখে মনে হচ্ছে প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে অদৃশ্য কোনো ভয় আরও কাছে চলে আসছে। রায়হান অজান্তেই পিছিয়ে যেতে লাগল। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠেছে, বুক ওঠানামা করছে অস্বাভাবিক গতিতে। মনে হচ্ছে চারপাশের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে গেছে। হেলাল কিছু বলছে না, শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে রাগ নেই, নেই কোনো অভিযোগ, চিৎকার বা হুমকি। অথচ সেই নীরবতাই যেন সবকিছুর চেয়ে ভয়ংকর। মনে হচ্ছে বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা কোনো অন্ধকার আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে হিসাব চাইতে এসেছে।
হঠাৎ রায়হান ঘুরে দৌড় দিল। করিডোর পেরিয়ে সিঁড়ির দিকে ছুটতে লাগল। তার জুতার শব্দ ফাঁকা ভবনের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। পেছনে তাকানোর সাহস হলো না আর। তবু তার মনে হচ্ছিল, কেউ একজন ঠিক তার পেছনেই হাঁটছে। নিশ্চিন্তে, যেন জানে শিকার পালিয়ে কোথাও যেতে পারবে না। কয়েক তলা সিঁড়ি একটানা ভেঙে অবশেষে সে ছাদে উঠে এল। ছাদের দরজা ঠেলে বাইরে আসতেই প্রবল বাতাস তার শরীরে আছড়ে পড়ল। নিচে শহরের অসংখ্য আলো জ্বলছে, কিন্তু এত ওপরে দাঁড়িয়ে সেগুলোও অদ্ভুত নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছে তার। চারপাশে শুধু অন্ধকার, বাতাস আর শূন্যতা। আর হ্যাঁ আরেকটা জিনিস আছে, সেটা হলো ভয়, জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধকে সামনে দেখলে হয়তো ভয় না থাকাটাই অস্বাভাবিক।
হাঁপাতে হাঁপাতে পেছনে তাকাল রায়হান। তার বুকের ভেতর যেন হৃদপিণ্ডটা ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আর তখনই সে তাকে দেখল, হেলাল দাঁড়িয়ে আছে তার থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে। এত বাতাসেও তার পোশাক বিন্দুমাত্র নড়ছে না, যেন সে এই পৃথিবীর কোনো মানুষ নয়। রায়হানের মাথার ভেতর তখন অতীতের সমস্ত স্মৃতি ঝড়ের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই রাত, সেই পরিকল্পনা, সেই গাড়ি, সেই বিশ্বাসঘাতকতা আর একজন মানুষের শেষ চিৎকার। বহু বছর ধরে চাপা দিয়ে রাখা অপরাধবোধ যেন একসঙ্গে জেগে উঠল। হেলাল আরেক পা এগিয়ে আসলে রায়হান পিছিয়ে গেল। আবার এক পা। তারপর আরও এক পা। আতঙ্কে সে খেয়ালই করল না, ছাদের কিনারা কখন তার পায়ের ঠিক পেছনে এসে গেছে। হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল সে। এক মুহূর্তের জন্য তার দুই হাত বাতাসে ছটফট করল। চোখে ফুটে উঠল চরম আতঙ্ক, তারপর তার শরীরটা নিচের অন্ধকারে তলিয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর একটি বিকট শব্দ রাতের নিস্তব্ধতাকে ছিন্নভিন্ন করে দিল। তারপর সব আবার শান্ত হয়ে গেল। যেন কিছুই ঘটেনি। শুধু দূরে কোথাও বাতাস বয়ে যাচ্ছে, রাত জাগা পাখিরা তাদের খাদ্যের খোঁজ করছে আর শহর তার নিজের ছন্দে রাত পার করে দিচ্ছে।
পরদিন সকালে বহুতল ভবনের নিচে রায়হানের ভাঙাচোরা দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় তদন্তকারী অফিসারের চোখ আটকে গেল একটি কাগজে। রক্তমাখা কাগজটি রায়হানের বুকের ওপর রাখা ছিল। আশপাশে এত রক্ত আর বিশৃঙ্খলার মধ্যেও কাগজটির লেখাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সেখানে লেখা ছিল মাত্র একটি নাম।
পাঁচ
রাত তখন প্রায় তিনটা। শহরের শেষপ্রান্তে অবস্থিত পুরোনো বাড়িটা অন্ধকারে ডুবে আছে। দিনের বেলায় বাড়িটিকে যতটা স্বাভাবিক মনে হয়, রাতের গভীরে ঠিক ততটাই পরিত্যক্ত মনে হয়। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পুরোনো আমগাছগুলো বাতাসে দুলছিল। পাতার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া চাঁদের ম্লান আলো বাড়ির দেয়ালে অদ্ভুত সব ছায়ার জন্ম দিচ্ছিল। বাতাসের সঙ্গে দুলতে থাকা সেই ছায়াগুলোকে দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল, যেন বাড়ির চারপাশে কেউ নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দূরে কোথাও কুকুরের দীর্ঘ ডাক শোনা যাচ্ছিল। তারপর আবার সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিল। এমন এক নিস্তব্ধতা, যেখানে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দও অস্বাভাবিক মনে হয়।
কামাল উদ্দিনের ঘুম ভাঙল হঠাৎ করেই। প্রথমে সে বুঝতে পারল না কেন জেগে উঠেছে। হঠাৎ তার মনে হলো, কেউ যেন তাকে দেখছে। অনুভূতিটা এতটাই তীব্র ছিল যে শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠল। সে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে ঘরের কোণের দিকে তাকাল। সেখানে কিছুই নেই। শুধু জমাট বাঁধা অন্ধকার। অথচ বুকের ভেতর ভয়টা কমল না। বরং আরও ঘন হয়ে উঠল, যেন অন্ধকারের ভেতর কোনো অদৃশ্য উপস্থিতি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ করছে।
কামাল বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পায়ের নিচে মেঝের পুরোনো কাঠ হালকা শব্দ করে উঠল। ঠিক তখনই করিডোর থেকে একটা শব্দ ভেসে এল। শব্দটা এত মৃদু যে প্রথমে মনে হলো হয়তো বাতাসের শব্দ, কিংবা কোথাও জানালার পাল্লা নড়েছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবার শোনা গেল, এবার স্পষ্ট। যেন কেউ ধীরে ধীরে পা টেনে হাঁটছে। শব্দটা করিডোরের গভীর অন্ধকার থেকে ভেসে আসছে। একবার শোনা যাচ্ছে, আবার থেমে যাচ্ছে। তারপর আবার শোনা যাচ্ছে। প্রতিবারই যেন একটু একটু করে কাছে চলে আসছে। কামালের গলা শুকিয়ে এলো, বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেল। সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে সুইচ টিপল, আলো জ্বলেনি। দ্বিতীয়বার চেষ্টা করল, তবুও না। মনে হলো পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ যেন হঠাৎ করেই নিভে গেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে করিডোরের অন্ধকারে একটা অবয়ব দেখতে পেল সে, মানুষের মতো। করিডোরের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অবয়বটাকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু এতটুকু বুঝতে বাকি রইল না যে ওটা কোনো আসবাবপত্রের ছায়া নয়। কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। মাথা নিচু করে, কোনো শব্দ না করে। কামালের বুকের ভেতর ধক করে উঠল। তার মনে হলো, কয়েক সেকেন্ড আগেও সেখানে কেউ ছিল না, কিন্তু এখন আছে। এবং অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা সেই অবয়বটাও যেন তাকে দেখছে।
বহু বছর আগের একটি মুখ তার স্মৃতির গভীর থেকে উঠে এলো। একটি নাম, যেটি সে কখনও উচ্চারণ করতে চায়নি। একটি ঘটনা, যেটিকে সে এতদিন ধরে মাটিচাপা দিয়ে রেখেছিল, “সাবিহা”। ষোলো বছরের মেয়েটি, এই বাড়িতেই কাজ করত। সরকারি কাগজে লেখা হয়েছিল, সে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু কামাল জানত, সেটি আত্মহত্যা ছিল না। সত্যিটা সে বহু বছর ধরে নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেবেছিল, হয়তো সবকিছু হারিয়ে গেছে, কিন্তু কিছু সত্য কখনও হারায় না। তারা শুধু অপেক্ষা করে, সঠিক সময়ের জন্য।
কামালের কপালে ঠান্ডা ঘাম জমল। তার চোখ করিডোরের অন্ধকারে স্থির হয়ে আছে। অবয়বটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল, কোনো শব্দ নেই শুধু এগিয়ে আসছে। চাঁদের ম্লান আলো ধীরে ধীরে তার মুখের ওপর পড়তে শুরু করল। ফ্যাকাশে চামড়া, এলোমেলো চুল আর অস্বাভাবিক স্থির দুটি চোখ। অথচ সেই শূন্য দৃষ্টি কামালের বুকের ভেতরের সব সাহস গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। মনে হচ্ছিল, সেই চোখ দুটো শুধু তাকে দেখছে না, তার অতীতের প্রতিটি লুকিয়ে রাখা অপরাধও দেখে ফেলছে। সে পিছিয়ে যেতে লাগল। মনে হচ্ছে ঘরের বাতাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে যাচ্ছে। দেয়ালগুলো যেন একটু একটু করে কাছে সরে আসছে। চারপাশের অন্ধকারও অস্বাভাবিকভাবে ঘন হয়ে উঠছে, যেন পুরো বাড়িটা তাকে ঘিরে ফেলেছে।
একসময় তার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেল, আর পেছানোর কোনো জায়গা নেই। সাবিহা তখন তার সামনে, খুব কাছে। এতটাই কাছে যে তার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাওয়ার কথা, কিন্তু কোনো নিঃশ্বাস নেই, আছে শুধু স্থির দুটি চোখ। আর সেই চোখের গভীরে এমন এক নীরবতা, যা যেকোনো চিৎকারের চেয়েও ভয়ংকর। কামাল চিৎকার করতে চাইল, গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। তার বুকের ভেতর হঠাৎ প্রচণ্ড চাপ অনুভূত হলো। মনে হলো অদৃশ্য কোনো হাত তার হৃদপিণ্ডকে মুঠোর ভেতর চেপে ধরেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগল, চোখের সামনে সবকিছু কাঁপতে শুরু করল। সে বুক আঁকড়ে ধরে মেঝেতে পড়ে গেল। চারপাশের দৃশ্য ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছিল। তবুও শেষ মুহূর্তে সে দেখল, সাবিহার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটি হাসি ফুটে উঠছে। সেটি প্রতিশোধের হাসি নয়, সেটি ছিল বিচার সম্পন্ন হওয়ার হাসি। এমন এক হাসি, যা বহু বছর ধরে অপেক্ষা করছিল।
পরদিন সকালে প্রতিবেশীরা দরজা খোলা দেখে ভেতরে ঢুকে কামাল উদ্দিনের নিথর দেহ খুঁজে পায়। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি হৃদরোগে মৃত্যুর ঘটনা বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু যারা লাশ দেখেছিল, তাদের অনেকেই পরে একটি বিষয় নিয়ে কথা বলেছিল। মৃত্যুর পরও কামালের চোখ দুটো বিস্ফারিত ছিল, যেন শেষ মুহূর্তে সে এমন কিছু দেখেছে, যা মানুষের দেখা উচিত নয়। আর মৃতদেহের পাশেই পড়ে ছিল একটি ছোট্ট কাগজ। কাগজটি কোথা থেকে এলো, কেউ বলতে পারেনি। সেখানে কাঁপা হাতে লেখা ছিল একটি মাত্র নাম, “সাবিহা”।
ছয়
ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে অন্ধকারের শরীর থেকে রাতের শেষ চিহ্নগুলো মুছে দিচ্ছে। পূর্ব আকাশে সূর্য এখনও পুরোপুরি ওঠেনি, কিন্তু তার আগমনী আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো মৃদু আলোয় চিকচিক করছিল। দূরের ক্ষেতের ওপর পাতলা কুয়াশার আস্তরণ ভেসে বেড়াচ্ছিল, যেন মাটির বুক থেকে ধোঁয়া উঠছে। রাতভর জেগে থাকা পাখিরা নীরব হয়ে গেছে, আর দিনের পাখিরা একে একে ডেকে উঠতে শুরু করেছে। চারপাশে নতুন দিনের ব্যস্ততার আভাস ফুটে উঠছে। প্রকৃতি ধীরে ধীরে নিজেকে জাগিয়ে তুলছিল, অথচ সেই সকালই কয়েকটি মৃত্যুর সাক্ষী হতে চলেছে। এমন কিছু মৃত্যুর, যেগুলোর ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না।
পুলিশ অফিসার আরিফ হোসেনের ঘুম ভেঙেছিল খুব ভোরে। থানার ডিউটি অফিসারের ফোন সাধারণত সুখবর নিয়ে আসে না। দীর্ঘ চাকরি জীবনে সে বিষয়টা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি, ফোনের ওপাশে থাকা কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক রকম গম্ভীর ছিল। রাতের শেষ প্রহরে ঘটে যাওয়া কয়েকটি মৃত্যুর খবর একে একে তার কানে পৌঁছেছিল। প্রথমে ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন বলেই মনে হয়েছিল। আলাদা আলাদা জায়গায় ঘটে যাওয়া স্বাভাবিক কিছু দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় মৃত্যু বলেই মনে হওয়ার কথা। কিন্তু রিপোর্টের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কয়েকটি তথ্য তার অভিজ্ঞ মনকে অস্বস্তিতে ভরিয়ে তুলেছিল। মৃত্যুগুলোর মধ্যে দৃশ্যমান কোনো সম্পর্ক নেই, তবুও কোথাও যেন অদৃশ্য একটি সুতো তাদের একসঙ্গে বেঁধে রেখেছে বলে মনে হচ্ছিল।
সকালের চা শেষ করেও সেই অস্বস্তি কাটল না। বহু বছরের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, অনেক সময় কোনো ঘটনার অসঙ্গতি চোখে দেখা যায় না, অনুভব করা যায়। আর এই মুহূর্তে তার ভেতরের সেই অনুভূতিটাই বারবার সতর্ক সংকেত দিচ্ছিল। টেবিলের ওপর রাখা প্রাথমিক রিপোর্টগুলো আরেকবার চোখ বুলিয়ে দেখল সে, তথ্যগুলো একই রকম হলেও কোথাও যেন কিছু একটা মিলছে না। যেন ছবির সব টুকরো সামনে রয়েছে, কিন্তু সেগুলো জোড়া লাগানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটা এখনও অনুপস্থিত।
থানা থেকে বের হওয়ার সময় আকাশে সূর্যের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। রাস্তাঘাটে মানুষজনের চলাচল শুরু হয়েছে। দোকানের শাটার উঠছে, হাটের দিকে কৃষকেরা হাঁটছে, স্কুলগামী শিশুদের কোলাহল ধীরে ধীরে শহরকে জাগিয়ে তুলছে। চায়ের দোকানগুলোতে সকালবেলার আড্ডা জমতে শুরু করেছে। সবকিছুই স্বাভাবিক, সবকিছুই প্রতিদিনের মতো। পৃথিবী যেন তার নিজস্ব নিয়মেই এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ আরিফের মনে হচ্ছিল, এই স্বাভাবিকতার আড়ালে কোথাও একটা অদৃশ্য ফাটল তৈরি হয়েছে। এমন একটি ফাটল, যা এখনও কারও চোখে ধরা পড়েনি, কিন্তু খুব শিগগিরই তার প্রভাব চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। আর অদ্ভুতভাবে তার মনে হচ্ছিল, রাতের ওই মৃত্যুগুলো হয়তো কোনো ঘটনার সমাপ্তি নয়, বরং আরও ভয়ংকর কিছুর শুরু।
প্রথমে সে গেল গ্রামের সেই নির্জন রাস্তায়, যেখানে রফিকের লাশ পাওয়া গেছে। সকাল গড়িয়ে তখন বেলা বাড়ছে, কিন্তু ঘটনাস্থলের চারপাশে এখনও কৌতূহলী মানুষের ভিড়। কেউ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কথা বলছে, কেউ দূর থেকে তাকিয়ে আছে আতঙ্ক মেশানো চোখে। ভিড়ের ভেতরে ভয়, বিস্ময় আর গুজবের মিশ্র ছাপ স্পষ্ট। কেউ বলছে ডাকাতি, কেউ বলছে পুরোনো শত্রুতা, আবার কেউ দাবি করছে রাতের অন্ধকারে অস্বাভাবিক কিছু দেখেছে। কিন্তু আরিফ এসব কথায় কান দিল না। বহু বছর ধরে তদন্ত করতে করতে সে শিখেছে, সত্য সাধারণত গুজবের ভিড়ে লুকিয়ে থাকে না। সে ঝুঁকে রক্তমাখা মাটির দিকে তাকাল, শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ এখনও স্পষ্ট। আশপাশের ঘাসেও ছড়িয়ে আছে সংঘর্ষের কিছু চিহ্ন। তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামল সেই ছোট্ট কাগজটির ওপর, যেটি প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। কাগজে একটি মাত্র নাম লেখা।
নামটি অদ্ভুতভাবে তার মনে থেকে গেল। কারণ মৃত ব্যক্তি রফিক, অথচ কাগজে লেখা অন্য একজনের নাম। বিষয়টা যতটা সাধারণ মনে হওয়ার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি অস্বস্তিকর লাগছিল।
সেখান থেকে বেরিয়ে সে রওনা হলো নদীর ব্রিজের দিকে, সূর্য তখন আরও ওপরে উঠেছে। সকালের কুয়াশা প্রায় কেটে গেছে, নদীর পানি রোদের আলোয় ঝিকমিক করছে। দূর থেকে দেখলে জায়গাটিকে শান্ত এবং স্বাভাবিক মনে হতো। কিন্তু ব্রিজের ভাঙা রেলিং আর নিচে উদ্ধারকাজে ব্যস্ত মানুষেরা সেই শান্তিকে মিথ্যা প্রমাণ করছিল। ডুবে যাওয়া গাড়িটি তখন নদীর বুক থেকে তোলা হয়েছে। কাদা আর শেওলায় ঢেকে থাকা গাড়িটা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন নদী নিজের গভীর থেকে কোনো অভিশপ্ত স্মৃতি তুলে এনেছে। ভেতরে পাওয়া গেছে তিনটি মৃতদেহ। শাহিন, আসিফ আর করিম। তিনজনের মৃত্যুই আপাতদৃষ্টিতে দুর্ঘটনা, কিন্তু আরিফের অভিজ্ঞতা তাকে বারবার সতর্ক করছিল। কারণ ড্যাশবোর্ডের ওপর পাওয়া ভেজা কাগজে লেখা নামটি আবারও তার মনোযোগ কাড়ল।
আরেকটি নাম, আরেকটি মৃতদেহ, আরেকটি রহস্য। আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, নামদুটো মৃতদের কারও নয়। যেন কেউ ইচ্ছা করেই মৃত্যুর পাশে আরেকটি মৃত্যুর ছায়া রেখে যাচ্ছে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে সে পৌঁছাল রাহেলা বেগমের বাড়িতে। পুরোনো বাড়িটির চারপাশে তখন অদ্ভুত এক নীরবতা। উঠানের আমগাছের ছায়া দীর্ঘ হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। বাতাস আছে, তবুও যেন চারপাশ অস্বাভাবিকভাবে স্থির। গ্রামের মহিলারা ফিসফিস করে কথা বলছে, কেউ কেউ চোখ মুছছে। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখে শোকের চেয়ে ভয়টাই বেশি স্পষ্ট। যেন তারা শুধু একটি মৃত্যুর জন্য শোক করছে না, বরং এমন কিছু নিয়ে আতঙ্কিত, যার ব্যাখ্যা তাদের জানা নেই। ঘরের ভেতরে ঢুকতেই আরিফের মনে হলো, মৃত্যুর আতঙ্ক এখনও দেয়ালের গায়ে লেগে আছে। বিছানাটা যেমন ছিল তেমনই আছে, টেবিলের ওপর অর্ধেক খাওয়া এক গ্লাস পানি। জানালার পর্দা বাতাসে সামান্য দুলছে, সবকিছু স্বাভাবিক, তবুও কোথাও যেন কিছু অস্বাভাবিক লুকিয়ে আছে। বিছানার পাশে পাওয়া কাগজে আবারও একটি নাম লেখা ছিল।
কাগজটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল আরিফ। তিনটি আলাদা ঘটনা, কয়েকটি মৃত্যু, কয়েকটি নাম। আর তাদের মধ্যে এমন একটি অদৃশ্য সম্পর্ক, যেটা এখনও তার চোখে ধরা পড়ছে না। কিন্তু সে নিশ্চিত, এই নামগুলোই রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু। আর হয়তো খুব শিগগিরই সেই নামগুলোর কোনো একটির পাশে আরেকটি মৃতদেহ পাওয়া যাবে।
আরিফ এবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। দিনের শুরু থেকে একের পর এক ঘটনাস্থল ঘুরে তার মাথার ভেতর একই প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। তিনটি ঘটনা, তিনটি মৃত্যু, তিনটি আলাদা স্থান। কিন্তু একই ধরনের চিরকুট, একই ধরনের রহস্য, প্রতিটি মৃতদেহের পাশে একটি নাম। আর সেই নামগুলো মৃত ব্যক্তিদের নয়। বিষয়টা যত ভাবছিল, ততই জটিল মনে হচ্ছিল। যেন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যুগুলোর ভেতর একটি অদৃশ্য সম্পর্ক রেখে গেছে, কিন্তু সেই সম্পর্কের অর্থ বুঝে ওঠার মতো যথেষ্ট সূত্র এখনও তার হাতে নেই।
সাত
বিকেলের শেষ আলো যখন পশ্চিম আকাশে গাঢ় হয়ে আসছে, তখন সে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনাস্থলে পৌঁছাল। বহুতল ভবনের সামনে এখনও মানুষের জটলা। কেউ মোবাইলে ছবি দেখছে, কেউ ঘটনার বিবরণ নিজের মতো করে অন্যদের শোনাচ্ছে। মাথা উঁচু করে তাকালে ভবনের ছাদের কিনারা দেখা যায়, সেখান থেকে পড়েই মৃত্যু হয়েছে রায়হানের। প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলেই মনে হচ্ছে। অন্তত ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি তাই বলছে। কিন্তু আরিফ এখন আর কোনো কিছু সহজভাবে নিতে পারছে না। মৃতদেহের সঙ্গে পাওয়া কাগজটি হাতে নিয়ে আবারও স্থির হয়ে গেল সে। সেখানে লেখা একটি মাত্র নাম, “হেলাল”।
নামটা পড়তেই তার ভ্রু কুঁচকে উঠল, আবারও একই ঘটনা! একজন মৃত, কিন্তু চিরকুটে অন্য একজনের নাম। চারটি মৃত্যুর পাশে চারটি ভিন্ন নাম। সূর্য তখন প্রায় ডুবে গেছে, আকাশে রক্তিম আলো ছড়িয়ে আছে। পশ্চিম দিগন্তটা অদ্ভুতভাবে লাল হয়ে আছে, যেন দিনের শেষ আলোও কোনো অজানা অশুভ ঘটনার সাক্ষী হয়ে বিদায় নিচ্ছে। আরিফের মনে হচ্ছিল, এই দিনটি যেন স্বাভাবিক কোনো দিন নয়। যেন সকাল থেকে সে এমন একটি গল্পের ভেতর দিয়ে হাঁটছে, যার শেষ অধ্যায় এখনও লেখা হয়নি।
শেষ ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমে এলো। কামাল উদ্দিনের বাড়ির চারপাশে অন্ধকার ধীরে ধীরে জমতে শুরু করেছে। বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ ছাড়া চারপাশ প্রায় নিস্তব্ধ। দিনের বেলার ভিড়ও অনেকটাই কমে গেছে, তদন্ত শেষ হওয়ার পথে। মৃতদেহ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অনেক আগেই। তবুও বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই আরিফের শরীরের ভেতর দিয়ে অজানা এক শীতলতা বয়ে গেল। এমন অনুভূতি তার নতুন নয়, কিন্তু অকারণও নয়। অনেক সময় কোনো জায়গা নিজের ভেতরে ঘটনার ভার বহন করে রাখে। এই বাড়িটাও যেন তেমনই। প্রমাণ হিসেবে রাখা কাগজটির দিকে তাকিয়ে সে দীর্ঘক্ষণ নীরব রইল। সেখানে লেখা ছিল আরেকটি নাম, “সাবিহা”।
বাইরে তখন রাত নামছে। দূরের মসজিদ থেকে এশার আজান ভেসে আসছে। আরিফ কাগজটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ অনুভব করল, পাঁচটি নাম যেন আলাদা নয়। তারা কোনো এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। এমন একটি সুতো, যার এক প্রান্ত মৃতদের কাছে, আর অন্য প্রান্ত কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে, তা এখনও অজানা। সে আবার নামগুলো মনে মনে সাজিয়ে দেখলো, শরিফ, সাথী, নাসিম, হেলাল আর সাবিহা। নামগুলো আলাদা, মানুষগুলো আলাদা, ঘটনাগুলোও আলাদা। তবু কোথাও যেন তারা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
দিনের শেষ আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে এক অদ্ভুত প্রশ্ন জন্ম নিল। যদি এই নামগুলো শুধু নাম না হয়? যদি এগুলোই আসল গল্পের শুরু হয়? যদি মৃতদের পাশে পাওয়া নামগুলো আসলে পরবর্তী শিকারের নাম হয়?
প্রশ্নটা মাথায় আসতেই তার বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি বয়ে গেল। কারণ যদি তার ধারণা সত্যি হয়, তাহলে এই রহস্য এখনও শেষ হয়নি, বরং মাত্র শুরু হয়েছে। আর তখনও সে জানত না, রাত শেষ হওয়ার আগেই সেই প্রশ্নের উত্তর তাকে খুঁজে নিতে হবে। কারণ এই পাঁচটি মৃত্যুর তদন্ত তাকে এমন এক সত্যের সামনে দাঁড় করাবে, যেখান থেকে ফিরে আসা সহজ নয়।
পরদিন সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। সারাদিনের রোদে উত্তপ্ত শহর ধীরে ধীরে শীতল হয়ে আসছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যের শেষ আলো নিভে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ লালচে আভা ছড়িয়ে ছিল, এখন সেটাও মিলিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠেছে। কর্মব্যস্ত মানুষজন ঘরে ফিরছে। দোকানের সামনে ভিড় জমছে। চায়ের স্টলগুলোতে সন্ধ্যার আড্ডা শুরু হয়ে গেছে। দূরে কোথাও গাড়ির হর্ন, কোথাও মানুষের কথাবার্তা, কোথাও দোকানিদের ডাকাডাকি। শহর তার স্বাভাবিক ছন্দে চলতে শুরু করেছে।
কিন্তু আরিফ হোসেনের কাছে দিনটা স্বাভাবিক ছিল না। সকালের পর থেকে এক মুহূর্তও বসার সুযোগ পায়নি সে। পাঁচটি মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে সারাদিন ধরে সে ছুটেছে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে। সাক্ষ্য নিয়েছে, পুরোনো রেকর্ড খুঁজেছে, থানার সংরক্ষিত নথি ঘেঁটেছে। প্রতিটি নামের পেছনে লুকিয়ে থাকা মানুষগুলোর অতীত জানার চেষ্টা করেছে। প্রতিটি মৃত ব্যক্তির পরিবার, পরিচিতজন, ব্যবসায়িক সম্পর্ক, সামাজিক অবস্থান, এমনকি বহু বছর আগের শত্রুতার খোঁজও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু যতই গভীরে গেছে, ততই অস্বস্তি বেড়েছে। কারণ ঘটনাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, অথচ সেই সম্পর্কের প্রকৃত রূপ এখনও স্পষ্ট নয়। যেন সে একটি বিশাল ধাঁধার টুকরোগুলো সংগ্রহ করেছে, কিন্তু কোন টুকরো কোথায় বসবে, সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না।
সন্ধ্যার একটু আগে থানায় ফিরতেই কন্সটেবল রবিউল তার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। সারাদিন দৌড়ঝাঁপ করার ক্লান্তি তার মুখেও স্পষ্ট। হাতে মোটা কয়েকটি ফাইল, পুরোনো নথি, নতুন রিপোর্ট, সাক্ষ্য, মেডিকেল রেকর্ড, জমির কাগজ, আদালতের কপি, হারিয়ে যাওয়া ডায়েরি, এমনকি বহু বছর আগের কিছু পত্রিকার কাটিংও সংগ্রহ করা হয়েছে। কাগজগুলোর অবস্থা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, অনেক কিছু বিভিন্ন আর্কাইভ আর রেকর্ড রুম ঘেঁটে বের করতে হয়েছে। রবিউল ফাইলগুলো টেবিলের ওপর রেখে বলেছিল, যতটুকু পাওয়া সম্ভব হয়েছে, সবই এখানে আছে।
আরিফ কিছুক্ষণ চুপচাপ ফাইলগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। তার সামনে পড়ে থাকা কাগজের স্তূপগুলো যেন শুধু তথ্য নয়, বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা অসংখ্য মানুষের গল্প বহন করে নিয়ে এসেছে। সাতটি মৃত্যু, পাঁচটি চিরকুট, পাঁচটি নাম। নামগুলো সারাদিন ধরে তার মাথার ভেতর ঘুরছে, অদ্ভুতভাবে সবকিছু যেন একটি জায়গায় এসে মিলতে চাইছে। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে আছে আরেকটি নাম। আর প্রতিটি নামের পেছনে হয়তো লুকিয়ে আছে আরেকটি গল্প।
থানার অধিকাংশ সদস্য তখন নিজেদের কাজে ব্যস্ত। কোথাও টাইপ করার শব্দ শোনা যাচ্ছে, কোথাও ফোন বেজে উঠছে, কোথাও কেউ রিপোর্ট লিখছে। কিন্তু আরিফের চারপাশের সব শব্দ যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল। তার সমস্ত মনোযোগ আটকে ছিল টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলোর দিকে। তার মনে হচ্ছিল, উত্তরগুলো এই কাগজের ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে। হয়তো এমন কোনো তথ্য, যেটা প্রথম দেখায় তুচ্ছ মনে হবে। হয়তো বহু বছর আগের কোনো ঘটনা, যেটা সবাই ভুলে গেছে। কিন্তু সেই হারিয়ে যাওয়া তথ্যই হয়তো পাঁচটি মৃত্যুর রহস্যের দরজা খুলে দিতে পারে।
বাইরে সন্ধ্যা আরও ঘন হয়ে আসছিল। জানালার কাঁচে প্রতিফলিত আলো ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে। আরিফ গভীর শ্বাস নিয়ে ফাইলগুলো নিজের দিকে টেনে নিল। বহু বছরের অভিজ্ঞতা তাকে একটি জিনিস শিখিয়েছে, সত্য কখনও হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায় না। তাকে খুঁজে বের করতে হয়। আর তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এই রহস্যের প্রথম উত্তর লুকিয়ে আছে এই পুরোনো কাগজগুলোর ভেতর।
থানা থেকে বের হওয়ার সময় রাত নেমে গেছে। শহরের ব্যস্ততা তখনও পুরোপুরি থামেনি, কিন্তু দিনের তুলনায় অনেকটাই শান্ত। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি বাতির আলো ছড়িয়ে আছে। কোথাও দোকান বন্ধ হচ্ছে, কোথাও শেষ মুহূর্তের ক্রেতাদের আনাগোনা। গাড়িতে বসেও আরিফের চোখ বারবার পাশের সিটে রাখা ফাইলগুলোর দিকে চলে প্রতিটি ফাইলের ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন কিছু ঘটনা, যেগুলো একসময় সংবাদ ছিল, তারপর ধীরে ধীরে বিস্মৃত হয়ে গেছে। কিন্তু এখন যেন সেই পুরোনো ঘটনাগুলো আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে।
আট
অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত আরও গভীর হলো। লিফট থেকে নেমে করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ করেই যেন তার ক্লান্তি অনুভূত হতে লাগল। সারাদিনের দৌড়ঝাঁপে শরীর অবসন্ন। চোখে জ্বালা করছে। মাথার ভেতর একটার পর একটা তথ্য ঘুরপাক খাচ্ছে। কোথাও কিছু একটা আছে, যেটা সে এখনও ধরতে পারছে না। অথচ অনুভব করতে পারছে, উত্তরটা খুব দূরেও নয়।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই নিঃশব্দ অন্ধকার তাকে স্বাগত জানাল। ফ্ল্যাটে সে একাই থাকে, জীবনের একটা সময় বিয়ে করেছিল, কিন্তু সংসার বেশিদিন টেকেনি। বহু বছর ধরে এই নির্জনতাই তার সঙ্গী। সাধারণত সে এই একাকীত্ব উপভোগ করে। দীর্ঘ তদন্তের পর ফিরে এসে এই নীরব ঘরটাকে তার ভালোই লাগে। কিন্তু আজ কেন জানি ঘরটাকে একটু বেশিই নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছে।
জানালার কাঁচের বাইরে শহরের আলো জ্বলছে। দূরে কোথাও গাড়ির হর্ন ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে পাশের ভবনের কোনো জানালায় আলো জ্বলছে, আবার নিভে যাচ্ছে। তবু ঘরের ভেতরে এক ধরনের ভারী নীরবতা জমে আছে। আরিফ ফাইলগুলো ড্রয়িংরুমের টেবিলের ওপর রাখল। তারপর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সারাদিন ধরে দেখা ঘটনাগুলো একে একে চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। রক্তমাখা রাস্তা, নদী থেকে তোলা ডুবে যাওয়া গাড়ি, শোকাচ্ছন্ন বাড়ি, ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া মানুষ, মৃত্যুভয়ে বিকৃত মুখ। সবকিছুর শেষে একটি করে কাগজ আর সেই কাগজে একটি করে নাম।
চোখ চলে গেল ফাইলগুলোর ওপর লেখা নামগুলোর দিকে। রফিক, শাহিন, আসিফ, করিম, রাহেলা বেগম, রায়হান, কামাল উদ্দিন। আর সেই নামগুলোর সাথে জুড়ে আছে আরও পাঁচটি নাম। শরিফ, সাথী, নাসিম, হেলাল, সাবিহা। মনে হচ্ছিল, মৃত মানুষেরা নিজেদের গল্প বলার জন্য অপেক্ষা করছে। তারা যেন নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, শুধু এমন একজনের অপেক্ষায়, যে তাদের কথা শুনবে।
আরিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। টেবিলের পাশে গিয়ে ধীরে ধীরে বসে পড়ল। তার সামনে ছড়িয়ে আছে কয়েকটি মৃত্যু, কয়েকটি নাম আর অসংখ্য প্রশ্ন। রাত এখনও অনেক বাকি। আর তার মনে হচ্ছিল, আজকের রাত হয়তো শুধু তদন্তের রাত নয়। হয়তো এই রাতেই বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা কোনো সত্য প্রথমবারের মতো মুখ দেখাতে শুরু করবে।
প্রথমে বাথরুমে গিয়ে মুখে পানি দিল। ঠান্ডা পানি মুখে পড়তেই সারাদিনের ক্লান্তি কিছুটা কমে এলো। তারপর ধীরে ধীরে ওজু করল। দিনের ব্যস্ততা আর তদন্তের চাপের ভেতরেও নামাজ কখনও বাদ দেয় না সে। এশার নামাজ আদায় করতে দাঁড়াল। দিনের সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত অস্বস্তি, সমস্ত প্রশ্ন কয়েক মুহূর্তের জন্য দূরে সরে গেল। সিজদায় মাথা রাখার সময় তার মনে হলো, সারাদিন ধরে যে ভারটা বুকের ভেতর জমে ছিল, তার কিছুটা যেন হালকা হয়ে এসেছে। পৃথিবীর সব রহস্যের উত্তর মানুষ খুঁজে পায় না, কিন্তু কিছু সময়ের জন্য অন্তত মন শান্ত হয়।
এশার নামাজ শেষে আরিফ হোসেন ড্রয়িংরুমের টেবিলের কাছে গেল, টেবিলের ওপর পাঁচটি ফাইল রাখা। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর সে প্রথম ফাইলটি নিজের দিকে টেনে নিল যেটার ওপর লিখা ছিল, “রফিক”। ফাইলের প্রথম পাতায় মৃতদেহের ছবি, তার নিচে প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট। আরও কয়েকটি পৃষ্ঠা উল্টাতেই সাক্ষ্য, পুরোনো রেকর্ড, জমির দলিল, থানার সংরক্ষিত নথি একে একে সামনে চলে এলো। পুরোনো কাগজগুলোর রঙ হলদেটে হয়ে গেছে। কিছু জায়গায় কালির দাগও ঝাপসা। তবু প্রতিটি পাতার ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন কিছু ঘটনা, যা একসময় মানুষের জীবন ও মৃত্যুর কারণ হয়েছিল।
আরিফ মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করল। প্রথমে ঘটনাগুলোকে সাধারণই মনে হয়েছিল। প্রায় পনেরো বছর আগের ঘটনা। তখন রফিক আর শরিফ ছিল একই গ্রামের ছেলে। বয়সে কাছাকাছি হওয়ায় ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছে, একই স্কুলে পড়েছে, একসঙ্গে নদীতে সাঁতার কেটেছে। গ্রামের মানুষ তাদের উদাহরণ দিত বন্ধুত্বের জন্য। কোনো উৎসব, কোনো মেলা, কোনো খেলাধুলা তাদের একজনকে ছাড়া আরেকজনকে কল্পনা করা যেত না। এমনকি গ্রামের বয়স্ক লোকেরাও বলত, এই বন্ধুত্ব কোনোদিন ভাঙবে না।
কিন্তু মানুষের জীবনে সবচেয়ে ভয়ংকর ভাঙনগুলো সাধারণত সবচেয়ে কাছের সম্পর্ক থেকেই শুরু হয়।
ফাইলের ভেতরের সাক্ষ্য অনুযায়ী, শরিফের বাবা মারা যাওয়ার পর তার নামে কয়েক বিঘা জমি আসে। জমিগুলোর অবস্থান ছিল এমন জায়গায়, যেগুলোর দাম সময়ের সঙ্গে দ্রুত বাড়ছিল। প্রথমদিকে শরিফ নিজেও জমিগুলোর প্রকৃত মূল্য বুঝতে পারেনি। কিন্তু রফিক বুঝেছিল, এবং খুব ভালোভাবেই বুঝেছিল। আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তার ভেতরে লোভ জন্মাতে শুরু করে। প্রথমে বিষয়টা কেউ বুঝতে পারেনি, কারণ বাইরে থেকে দেখলে তাদের সম্পর্ক আগের মতোই ছিল। তারা একসঙ্গেই চলাফেরা করত, একসঙ্গেই চায়ের দোকানে বসত, একসঙ্গেই বাজারে যেত। কিন্তু ফাইলের সাক্ষ্যগুলো পড়তে পড়তে আরিফ বুঝতে পারল, মানুষের হাসিমুখের আড়ালে অনেক সময় এমন কিছু ইচ্ছা লুকিয়ে থাকে, যা একসময় বন্ধুত্বকেও হত্যা করতে পারে।
রফিক ধীরে ধীরে শরিফের সবচেয়ে বিশ্বাসভাজন মানুষ হয়ে ওঠে। জমি বিক্রি, কাগজপত্র, স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগ, সবকিছুতেই সাহায্য করার নাম করে সে শরিফের জীবনে আরও গভীরে প্রবেশ করে। গ্রামের অনেকেই তখন বলত, শরিফ নিজের ভাইয়ের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করে রফিককে। আর সেই বিশ্বাসই একসময় তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়।
তারপর শুরু হয় প্রতারণা। ফাইলের একটি অংশে লেখা ছিল, শরিফের স্বাক্ষর জাল করে কয়েকটি কাগজ তৈরি করা হয়েছিল। জমির মালিকানা নিয়ে নথি পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছিল। প্রথমদিকে বিষয়টি গোপনই ছিল, কিন্তু কোনো এক পর্যায়ে শরিফ কাগজপত্রে অসঙ্গতি খুঁজে পায়। কয়েকটি নথি যাচাই করতে গিয়ে সে বুঝতে পারে, তার অজান্তেই অনেক কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। আর সেই মুহূর্ত থেকেই তাদের সম্পর্কের ভেতরে ফাটল ধরতে শুরু করে। যে মানুষটিকে সে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করত, সন্দেহের তীর গিয়ে প্রথমে তাকেই আঘাত করে।
একজন বৃদ্ধ সাক্ষীর জবানবন্দি পড়তে পড়তে আরিফ কিছুক্ষণ থেমে গেল। লোকটি লিখিত বিবৃতিতে জানিয়েছিল, ঘটনার কয়েকদিন আগে নদীর পাড়ে রফিক ও শরিফের মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছিল। দূর থেকে তাদের চিৎকার শুনেছিল সে, দুজনকেই উত্তেজিত অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। কিন্তু কী নিয়ে ঝগড়া হচ্ছিল, তা শোনেনি। সে ভেবেছিল, বন্ধুদের মধ্যে সাময়িক কোনো বিরোধ। কয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তারপর যা ঘটেছিল, তা আর কখনও ঠিক হয়নি।
পরবর্তী পাতায় পৌঁছে আরিফের চোখ ধীরে ধীরে স্থির হয়ে গেল। ঘটনার রাতে নিখোঁজ হয় শরিফ। পরিবার প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো কোথাও গেছে। কিন্তু রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে গেলেও সে ফেরেনি। পরদিন তার স্যান্ডেল পাওয়া যায় নদীর তীরে। বিষয়টি তখনও রহস্যই ছিল, কিন্তু দুই দিন পর নদী থেকে উদ্ধার করা হয় তার মৃতদেহ। ফাইলের সঙ্গে সংযুক্ত ছবিগুলো দেখল আরিফ। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে দেহের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তদন্তে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। রিপোর্টে লেখা ছিল, রাতে নদীর ঘাটে গিয়ে পা পিছলে পড়ে ডুবে মৃত্যু হয়েছে, মামলাটিও দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। কারণ কোনো সাক্ষী বা প্রমাণ ছিল না। আর মৃত ব্যক্তির সবচেয়ে কাছের মানুষদের একজন ছিল রফিক নিজেই, তদন্তের সময় সে শোকাহত বন্ধুর ভূমিকাই পালন করেছিল। কেউ তখন তার দিকে আঙুল তোলেনি।
কিন্তু কয়েক বছর আগে নতুন একটি তথ্য সামনে আসে। আরিফ সামনের পৃষ্ঠাটি ধীরে ধীরে উল্টাল।
ফাইলের ভেতরে সংযুক্ত ছিল একটি অপ্রকাশিত জবানবন্দি। কাগজটির ওপর লাল কালিতে লেখা ছিল, “মৃত্যুর পূর্বে প্রদত্ত বিবৃতি”। এক বৃদ্ধ মৃত্যুর আগে সেটি দিয়ে গিয়েছিল। হয়তো দীর্ঘদিনের ভয়, অপরাধবোধ কিংবা সত্য প্রকাশের তাগিদ তাকে শেষ বয়সে মুখ খুলতে বাধ্য করেছিল। সেখানে দাবি করা হয়েছিল, ঘটনার রাতে সে দূর থেকে দুইজন মানুষকে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল। জায়গাটা অন্ধকার ছিল, কিন্তু চাঁদের আলো আর তাদের কণ্ঠস্বরের কারণে দুজনকে চিনতে পেরেছিল সে। তাদের একজন ছিল শরিফ, আরেকজন রফিক।
এরপর কী হয়েছিল, সে দেখেনি। কারণ কিছুক্ষণ পর সে সেখান থেকে চলে গিয়েছিল। কিন্তু পরদিন যখন শরিফ নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়ায়, তখন সেই দৃশ্য তার মনে পড়ে। তারপর নদী থেকে লাশ উদ্ধার হওয়ার পর তার সন্দেহ আরও গভীর হয়। তবুও সে মুখ খোলেনি, হয়তো ভয় পেয়েছিল। হয়তো প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করতে চায়নি। অথবা হয়তো ভেবেছিল, এতদিন পর সত্য বললেও আর কোনো পরিবর্তন হবে না।
কাগজটা নামিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল আরিফ। বাইরে রাত আরও গভীর হয়েছে। জানালার ওপারে শহরের আলো এখনও জ্বলছে, কিন্তু তার মন এখন পনেরো বছর আগের সেই নদীর তীরে আটকে আছে। ধীরে ধীরে একটা বিষয় পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। শরিফের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলা হয়েছিল, কিন্তু যদি সেটি দুর্ঘটনা না হয়ে থাকে? যদি রফিক সত্যিই তার বন্ধুর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তাকে হত্যা করে থাকে?
তাহলে আজকের চিরকুটে লেখা “শরিফ” নামটার অর্থ কী? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই আরিফের ভেতরে অদ্ভুত এক শীতলতা ছড়িয়ে পড়ল। কারণ হঠাৎ করেই তার মনে হতে লাগল, মৃতদেহগুলোর পাশে পাওয়া নামগুলো হয়তো এলোমেলো নয়। হয়তো প্রতিটি নাম এমন একজন মানুষের, যার সঙ্গে মৃত ব্যক্তির অতীতের কোনো অন্ধকার সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। আর যদি সেটাই সত্যি হয়, তাহলে গত রাতের মৃত্যুগুলো শুধুমাত্র হত্যাকাণ্ড নয়। সেগুলো যেন বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা কোনো হিসাবের নিষ্ঠুর সমাপ্তি। চিন্তাটা মাথায় আসতেই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শীতলতা ছড়িয়ে পড়ল। কারণ সামনে এখনও চারটি ফাইল পড়ে আছে। আর প্রতিটি ফাইলের ভেতরে হয়তো লুকিয়ে আছে আরও ভয়ংকর সত্য।
নয়
আরিফ ধীরে ধীরে দ্বিতীয় ফাইলটি নিজের দিকে টেনে নিল। ফাইলের ওপরে লেখা ছিল কামাল উদ্দিন। তার ঠিক নিচে লাল কালি দিয়ে গোল করে ঘেরা একটি নাম, সাবিহা। ফাইলটি খুলতেই প্রথম পাতায় ভেসে উঠল কামাল উদ্দিনের ছবি। মৃত্যুর পর তোলা ছবি, বিস্ফারিত চোখ, শক্ত হয়ে থাকা চোয়াল, আর মুখজুড়ে জমে থাকা আতঙ্ক। ছবিটি কয়েক সেকেন্ড দেখেই আরিফ পৃষ্ঠা উল্টে দিল। পুলিশের চাকরিতে এমন দৃশ্য তার নতুন নয়, তবুও কিছু কিছু মুখ মৃত্যুর পরও যেন শেষ মুহূর্তের গল্প বলে যায়। কামালের মুখটাও তেমনই লাগছিল।
প্রথম অংশে ছিল প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, মৃত্যুর কারণ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ। শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি, জোরপূর্বক প্রবেশের কোনো প্রমাণও নেই। চুরি বা ডাকাতির কোনো আলামত মেলেনি। কাগজে-কলমে সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে, অন্তত রিপোর্ট তাই বলছে। কিন্তু সমস্যাটা ছিল অন্য জায়গায়, সেই একই ধরনের চিরকুট। আর সেখানে লেখা একটি মাত্র নাম, সাবিহা।
আরিফ সামনে ঝুঁকে পড়ল। আগের ফাইলের পর এখন আর কোনো নামকেই সাধারণভাবে নিতে পারছে না সে। পরবর্তী পাতাগুলোতে ছিল সাবিহা নামের মেয়েটির তথ্য। বয়স মাত্র ষোলো, আট বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিল। তিন দিন পর গ্রামের এক বাঁশঝাড়ের পাশে তার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে আত্মহত্যা বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মামলাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। কাগজে থাকা তথ্যগুলো পড়লে ঘটনাটাকে একটি সাধারণ আত্মহত্যা বলেই মনে হয়। কিন্তু আরিফ জানে, অনেক সময় সবচেয়ে সাধারণ বলে মনে হওয়া ঘটনাগুলোর ভেতরেই সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য লুকিয়ে থাকে।
ফাইলের এই অংশ পর্যন্ত এসে তার কপাল কুঁচকে গেল। কারণ এতক্ষণ পর্যন্ত ঘটনাটি একটি সাধারণ আত্মহত্যার মামলার মতোই দেখাচ্ছিল। কিন্তু আগের ফাইলও শুরু হয়েছিল ঠিক এভাবেই, সেখানেও প্রথমে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। তারপর একের পর এক বেরিয়ে এসেছিল লুকিয়ে থাকা সত্য, পুরোনো বিশ্বাসঘাতকতা আর চাপা পড়ে থাকা অপরাধের ইতিহাস।
এরপর সংযুক্ত ছিল কয়েকটি সাক্ষ্য। প্রথমে প্রতিবেশীদের, তারপর সাবিহার এক বান্ধবীর, তারপর একটি অসম্পূর্ণ জবানবন্দি, যেটা কখনও আদালতে জমা পড়েনি। বিষয়টা তার দৃষ্টি এড়াল না, আগের ফাইলেও এমন একটি জবানবন্দি ছিল, যা আনুষ্ঠানিক তদন্তের অংশ হয়নি। যেন গুরুত্বপূর্ণ সত্যগুলো কোনো না কোনো কারণে প্রতিবারই মূল তদন্তের বাইরে থেকে গেছে।
আরিফ ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করল। জবানবন্দিটি দিয়েছিল গ্রামের এক বৃদ্ধা। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া সেই নারী সাবিহাদের বাড়ির পাশেই থাকত। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সাবিহা ছিল শান্ত স্বভাবের মেয়ে। চুপচাপ নিজের কাজ করত। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে পর্যন্তও তাকে স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল কিন্তু তারপর হঠাৎ করেই তার আচরণ বদলাতে শুরু করে। মেয়েটি আগের মতো কারও সঙ্গে কথা বলত না। অনেক সময় একা একা বসে থাকত, কাউকে দেখলেই চমকে উঠত। যেন কোনো অদৃশ্য ভয় তাকে সারাক্ষণ তাড়া করে ফিরছিল।
আরিফের চোখ ধীরে ধীরে পরের লাইনে গিয়ে থামল। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল সেই অংশ, যেটা হয়তো আট বছর আগে পুরো মামলার গতিপথ বদলে দিতে পারত। বৃদ্ধার দাবি ছিল, মৃত্যুর আগের রাতে সে সাবিহাকে কাঁদতে দেখেছিল। আর তার সঙ্গে ছিল কামাল উদ্দিন, দুজনের মধ্যে তর্ক হচ্ছিল। সাবিহা বারবার কিছু একটা বলছিল, যেন কোনো বিষয়ে জবাব চাইছে বা প্রতিবাদ করছে। আর কামাল তাকে থামানোর চেষ্টা করছিল। দূরত্ব বেশি থাকায় কথাগুলো স্পষ্ট শোনা যায়নি, কিন্তু তাদের আচরণ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, বিষয়টি সাধারণ কোনো ঝগড়া নয়। কিছুক্ষণ পর তারা অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যায়। বৃদ্ধা ভয়ে কাউকে কিছু বলেনি, পরের দিনই সাবিহার মৃত্যুর খবর আসে।
আরিফ আরও সামনে এগোল। এরপরের নথিগুলো ছিল আরও অস্বস্তিকর। সাবিহার মৃত্যুর পর স্থানীয়ভাবে নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ বলেছিল মেয়েটি গর্ভবতী ছিল, কেউ বলেছিল সে কারও বিরুদ্ধে মুখ খুলতে যাচ্ছিল। আবার কেউ দাবি করেছিল, আত্মহত্যার আগের কয়েক সপ্তাহ ধরে তাকে প্রায়ই আতঙ্কিত অবস্থায় দেখা যেত। অনেক সময় সে একা একা কাঁদত, আবার অনেক সময় কাউকে দেখলেই চুপ হয়ে যেত। কিন্তু এসব কথার কোনোটাই কখনও প্রমাণে পরিণত হয়নি। কারণ যাদের মুখে এসব কথা ছিল, তারা পরে সবাই চুপ হয়ে যায়। কেউ আর প্রকাশ্যে কিছু বলতে চায়নি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গুজবগুলোও হারিয়ে যায়, আর মামলাটা ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায় মানুষের স্মৃতির ভিড়ে।
ফাইলের শেষ অংশে ছিল একটি নোট। এটি নতুন তদন্তে যোগ করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, সাবিহার মৃত্যুর সময়কার মেডিকেল রিপোর্টে কিছু অসঙ্গতি ছিল, যেগুলো কখনও গুরুত্ব পায়নি। রিপোর্টে থাকা কয়েকটি তথ্য আত্মহত্যার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। বরং এমন কিছু ইঙ্গিত ছিল, যা অন্য কিছুর দিকে নির্দেশ করছিল। আরও গভীর, আরও অন্ধকার কোনো সত্যের দিকে, খুনের দিকে।
আরিফ ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে পেছনে হেলান দিল। কিছুক্ষণ চুপচাপ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার চোখ আবার গিয়ে পড়ল টেবিলের ওপর রাখা চিরকুটের ছবির দিকে, সাবিহা। একজন মৃত মেয়ে, আট বছর আগে যার মামলা বন্ধ হয়ে গেছে। আর আজ তার নাম পাওয়া গেছে এমন একজন মানুষের লাশের পাশে, যাকে নিয়ে সেই মামলার অন্ধকার সন্দেহগুলো বছরের পর বছর ধরে ঘুরপাক খেয়েছে।
ঘরের বাতাস হঠাৎ যেন ভারী হয়ে উঠল। আরিফ জানালার দিকে তাকাল, বাইরে রাত আরও গভীর হয়েছে। দূরের আলো ঝাপসা দেখাচ্ছে। পাশের ভবনের কয়েকটি জানালায় এখনও আলো জ্বলছে, কিন্তু সেগুলোও যেন অনেক দূরের কোনো জগতের অংশ। তার মনে হচ্ছিল, এই ফাইলগুলো শুধু পুরোনো অপরাধের কাগজ নয়। এগুলো এমন কিছু মানুষের গল্প, যারা জীবিত অবস্থায় ন্যায়বিচার পায়নি। এমন কিছু সত্যের গল্প, যেগুলোকে ইচ্ছে করে চাপা দেওয়া হয়েছিল।
আরিফ কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। ঘরের বাতাসে এক ধরনের ভারী নীরবতা জমে উঠেছে। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির কাঁটা নিয়মিত শব্দে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার কাছে সময় যেন ধীরে ধীরে চলতে শুরু করেছে। জানালার বাইরে রাত আরও গভীর হয়েছে। দূরের ভবনগুলোর কিছু জানালায় এখনও আলো জ্বলছে, কোথাও কোথাও আলো নিভে গেছে। নিচের রাস্তা দিয়ে মাঝেমধ্যে দু-একটি গাড়ি চলে যাচ্ছে। সেই শব্দও কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। ঘরের ভেতরে শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর পৃষ্ঠা ওল্টানোর মৃদু আওয়াজ। সেই নীরবতার মধ্যেই আরিফ ধীরে ধীরে সামনে রাখা আরেকটি ফাইল নিজের দিকে টেনে নিল।
দশ
ফাইলের ওপর লেখা নামটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সে, রায়হান। আর নিচে লাল কালিতে ঘেরা আরেকটি নাম, হেলাল।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই নামটি তার মাথায় শুরু থেকেই অন্যরকমভাবে আটকে ছিল। হয়তো কারণ রায়হানের মৃত্যুর ধরন অন্যদের চেয়ে ভিন্ন ছিল। কেউ গলা কেটে খুন হয়েছে, কেউ গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে, কেউ আতঙ্কে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু রায়হানের মৃত্যু ছিল পতনের মৃত্যু। বহুতল ভবনের ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া এক মানুষের মৃত্যু।
আরিফ ফাইল খুলল। প্রথম পাতাতেই রায়হানের একটি বড় ছবি। হাস্যোজ্জ্বল মুখ, পরিপাটি পোশাকে আত্মবিশ্বাসী ভাব। ছবির মানুষটিকে দেখে বোঝার উপায় নেই, মৃত্যুর আগে শেষ কয়েক মিনিটে সে চরম আতঙ্কের মধ্য দিয়ে গেছে। এমন একজন মানুষের ছবি, যাকে দেখলে সফল, স্থির এবং আত্মবিশ্বাসী বলেই মনে হয়। অথচ মানুষের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলো সাধারণত ছবিতে ধরা পড়ে না।
আরিফ পৃষ্ঠা উল্টাল, ধীরে ধীরে রায়হানের জীবনের বিবরণ সামনে আসতে লাগল। প্রায় পনেরো বছর আগে রায়হান ও হেলাল একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করেছিল। শুরুটা ছিল ছোট, শহরের এক কোণে ভাড়া করা একটি অফিস। কয়েকটি চেয়ার, একটি টেবিল আর বুক ভর্তি বড় হওয়ার স্বপ্ন। ব্যবসা দাঁড় করানোর জন্য তারা দিনরাত পরিশ্রম করেছিল। অনেকেই তখন বলত, দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া অসাধারণ। একজন যা ভাবত, অন্যজন তা বুঝে ফেলত। তাদের বন্ধুত্ব নিয়েও শহরে অনেক গল্প ছিল। বিশ্বাস ছিল অটুট, অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হতো।
বছরের পর বছর ব্যবসা বড় হয়েছে। টাকা এসেছে, প্রভাব এসেছে, পরিচিতি বেড়েছে। কিন্তু অর্থের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ভেতরের কিছু জিনিসও বদলাতে শুরু করে। সম্পর্ক বদলেছে, অগ্রাধিকার বদলেছে, আর একসময় সেই পরিবর্তনের সঙ্গে এসেছে লোভ।
ফাইলের একটি অংশে পুরোনো আর্থিক নথি সংযুক্ত ছিল। সেগুলো ঘাঁটতে গিয়ে আরিফের চোখে কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়ল। বড় অঙ্কের টাকা হঠাৎ এক অ্যাকাউন্ট থেকে আরেক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে। কিছু জমি কেনাবেচার নথিতে অদ্ভুত অসামঞ্জস্য। এমন কিছু স্বাক্ষর, যা প্রথম দৃষ্টিতে ঠিক মনে হলেও গভীরভাবে দেখলে সন্দেহ জাগে। কয়েকটি আর্থিক সিদ্ধান্তের কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যাও পাওয়া যাচ্ছে না। যেন কেউ খুব সতর্কভাবে হিসাবের ভেতর কিছু লুকিয়ে রেখেছিল।
আরিফ আরও মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগল। তার অভিজ্ঞতা বলছিল, এই অসঙ্গতিগুলোই হয়তো পুরো ঘটনার মূল সূত্র। অনেক সময় খুনের শুরু অস্ত্র দিয়ে হয় না, শুরু হয় বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে। আর অনেক সময় সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধের পেছনে থাকে অর্থ আর লোভ।
একসময় সামনে এলো সেই রাতের ঘটনা। আজ থেকে প্রায় নয় বছর আগের কথা। বর্ষাকালের রাত, সারাদিন বৃষ্টি হয়েছিল। সন্ধ্যার পর বৃষ্টি কিছুটা কমলেও আকাশে ভারী মেঘ জমে ছিল। চারপাশে কাদা, ভেজা রাস্তা আর বৃষ্টির পরের সেই স্যাঁতসেঁতে নীরবতা। সেই রাতে হেলালকে শেষবার দেখা যায় রায়হানের সঙ্গে। জানা যায়, তারা দুজন শহরের বাইরে একটি জমি দেখতে গিয়েছিল। এরপর আর কেউ হেলালকে জীবিত দেখেনি।
পরদিন সকালে একটি খাদে পড়ে থাকা গাড়ি উদ্ধার করা হয়। স্টিয়ারিংয়ে বসা অবস্থায় পাওয়া যায় হেলালের দেহ। তদন্তে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। মামলার কাগজপত্র তৈরি হয়, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়, তারপর ফাইলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে মানুষও ঘটনাটি ভুলে যায়।
আরিফের চোখ গিয়ে থামল একটি নতুন সংযুক্ত রিপোর্টে। রিপোর্টটি তৈরি করা হয়েছে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে। পুরোনো সাক্ষ্য, নতুন অনুসন্ধান এবং কিছু গোপন তথ্য একত্র করে তৈরি করা হয়েছে সেটি। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্ঘটনার দিন গাড়ির ব্রেকিং সিস্টেমে ইচ্ছাকৃতভাবে গন্ডগোল বাধানো হয়েছিল বলে সন্দেহ রয়েছে। যদিও এত বছর পরে সেটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব। সময় অনেক প্রমাণকেই মুছে দেয়। কিন্তু সন্দেহকে পুরোপুরি মুছে দিতে পারে না।
আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। দুর্ঘটনার মাত্র এক মাস আগে হেলাল নিজের নামে থাকা ব্যবসার অংশীদারিত্ব রায়হানের কাছে হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে একাধিকবার বিরোধ হয়েছিল বলেও কয়েকজন সাক্ষী দাবি করেছে। এরপর থেকেই তাদের সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে ফাটল তৈরি হচ্ছিল। আর সেই ফাটল একসময় কতটা গভীর হয়েছিল, তা আর কেউ জানত না।
আরিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বাইরে হঠাৎ বাতাসের একটি ঝাপটা এসে জানালার কাঁচ কাঁপিয়ে দিল। সে মাথা তুলে কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে রইল। রাত আরও ঘন হয়ে এসেছে। দূরের ভবনগুলোর আলো ঝাপসা দেখাচ্ছে। কোথাও কোনো উত্তর নেই, অথচ উত্তরগুলো যেন ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে।
তার মনে হচ্ছিল, গল্পটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে। প্রথমে শরিফ, তারপর সাবিহা আর এখন হেলাল। তিনজন মৃত মানুষ, আর তিনজন জীবিত মানুষ, যারা বহু বছর পর নিজেরাও মৃত হয়েছে। ঘটনাগুলো আলাদা, মানুষগুলো আলাদা, কিন্তু ভেতরের ছায়াটা যেন একই। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো না কোনো বিশ্বাসঘাতকতা, কোনো না কোনো চাপা পড়ে থাকা অপরাধ।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত প্রশ্নটা এখনও উত্তরহীন। যদি এসব কেবল পুরোনো অপরাধের ফল হয়, তাহলে চিরকুটগুলো কে রেখে যাচ্ছে? আর কেন?
ফাইলের শেষ অংশে পৌঁছে আরিফ থেমে গেল। সেখানে একটি সাক্ষাৎকারের সারাংশ সংযুক্ত ছিল। সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছিল হেলালের ছোট ভাই রনির কাছ থেকে। বছরের পর বছর সে বিশ্বাস করে এসেছে, তার ভাই দুর্ঘটনায় মারা যায়নি। কেউ তাকে মেরেছে, কিন্তু তার কাছে কোনো প্রমাণ ছিল না। শুধু সন্দেহ ছিল, আর ছিল এক ধরনের অদ্ভুত বিশ্বাস, যা সময়ের সঙ্গেও মুছে যায়নি।
সাক্ষাৎকারের শেষ লাইনটি পড়ে আরিফের ভ্রু কুঁচকে গেল। রনি বলেছিল, মানুষের আদালত অনেক সময় বিচার করতে পারে না। কিন্তু কিছু বিচার আছে, যেগুলো খুব দেরিতে হলেও হয়।
কথাগুলো পড়ার পর কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইল সে। বাক্যটি সাধারণ হলেও এই মামলার প্রেক্ষাপটে অস্বস্তিকরভাবে অর্থবহ মনে হচ্ছিল।
আরিফ ধীরে ধীরে ফাইলটি বন্ধ করল। ঘরের ভেতর তখন আবার নীরবতা নেমে এসেছে। দেয়ালের ঘড়িতে রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। টেবিলের ওপর এখনও দুটি ফাইল পড়ে আছে। রাহেলা বেগম আর শাহিন, আসিফ, করিম।
সে কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল, সামনে থাকা বাকি দুটি ফাইল হয়তো এই রহস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ লুকিয়ে রেখেছে। আর হয়তো সেখানেই রয়েছে সেই প্রশ্নের উত্তর, যেটা সন্ধ্যা থেকে তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে।
এগার
অদ্ভুতভাবে তার মনে হচ্ছিল, যত এগোচ্ছে, ততই সে কোনো রহস্যের সমাধানের দিকে নয়, বরং এমন কিছুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেটিকে ব্যাখ্যা করা কঠিন। বাইরে বাতাস আরও জোরে বইতে শুরু করেছে। জানালার কাঁচে মাঝে মাঝে হালকা কম্পন অনুভূত হচ্ছে। টেবিলের পাশে রাখা জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে ধীরে ধীরে পান করল সে। ঠান্ডা পানি গলা বেয়ে নিচে নামলেও মাথার ভেতরের অস্বস্তি কমল না। তারপর হাত বাড়িয়ে পরের ফাইলটি টেনে নিল।
ফাইলের ওপর লেখা নামটি দেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। মোটা অক্ষরে লিখা আছে রাহেলা বেগম, নিচে লাল কালিতে লেখা আরেকটি নাম, নাসিম।
অন্যগুলোর তুলনায় এই ফাইলটি কিছুটা পাতলা। কিন্তু আরিফের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে, পাতার সংখ্যা দিয়ে গল্পের ওজন বিচার করা যায় না। অনেক সময় সবচেয়ে ছোট ফাইলের ভেতরই সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য লুকিয়ে থাকে।
ফাইল খুলতেই প্রথম পাতায় রাহেলা বেগমের একটি পুরোনো ছবি চোখে পড়ল। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে তখন। মুখে কঠোরতার ছাপ, চোখে এমন একটি দৃষ্টি, যেটা দেখে বোঝা যায় তিনি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে অভ্যস্ত ছিলেন। গ্রামের অনেক মানুষ তাকে সম্মান করত, আবার অনেকেই তাকে এড়িয়ে চলত। ফাইলের সঙ্গে সংযুক্ত কয়েকটি সাক্ষ্যে উল্লেখ ছিল, তিনি সহজে কাউকে বিশ্বাস করতেন না এবং নিজের সম্পত্তি নিয়ে সবসময় সতর্ক থাকতেন।
পরের পাতায় তার পারিবারিক ইতিহাস। স্বামী মারা গেছেন প্রায় পনেরো বছর আগে। নিজস্ব কিছু জমিজমা আছে। সন্তান নেই, তবে স্বামীর প্রথম পক্ষের একটি ছেলে ছিল। নাম নাসিম। এই নামটি পড়তেই আরিফের চোখ স্থির হয়ে গেল।
ফাইলের পরবর্তী অংশে নাসিমের তথ্য সংযুক্ত ছিল। শান্ত স্বভাবের ছেলে, পড়াশোনায় ভালো। গ্রামের স্কুলে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ছিল। কয়েকজন শিক্ষকের সাক্ষ্য অনুযায়ী, সে মেধাবী এবং ভদ্র ছিল। গ্রামের অনেকেই বিশ্বাস করত, সুযোগ পেলে হয়তো সে অনেক দূর যেতে পারত। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।
কারণ প্রায় বারো বছর আগে হঠাৎ করেই সে নিখোঁজ হয়ে যায়। প্রথম কয়েকদিন পরিবার খোঁজাখুঁজি করে। আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে খোঁজ নেওয়া হয়। আশপাশের থানা, হাসপাতাল, বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করা হয়। পরে পুলিশে জিডিও করা হয়, কিন্তু কোনো ফল পাওয়া যায়নি। কয়েক মাস কেটে যায়, তারপর বছর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনুসন্ধানও থেমে যায়।
অবশেষে সবাই ধরে নেয়, ছেলেটি হয়তো কোথাও চলে গেছে। কেউ বলে প্রেম করে পালিয়েছে। কেউ বলে কাজের খোঁজে অন্য শহরে গেছে। আবার কেউ কেউ দাবি করেছিল, পারিবারিক অশান্তির কারণে সে নিজেই সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। কিন্তু এসবই ছিল অনুমান, সত্যিটা কেউ জানত না।
সময় যত এগিয়েছে, ততই তার নাম মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে শুরু করেছে। নতুন ঘটনা এসেছে, নতুন মানুষ এসেছে, আর পুরোনো রহস্য ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে গ্রামের গল্পের ভিড়ে। শুধু কাগজের ভেতরে রয়ে গেছে কয়েকটি রিপোর্ট, কয়েকটি সাক্ষ্য আর এক নিখোঁজ মানুষের নাম।
আরিফ ধীরে ধীরে পরের পৃষ্ঠায় গেল। সেখানে ছিল নতুন তদন্তে পাওয়া কিছু তথ্য। প্রথমেই চোখে পড়ল একটি পুরোনো জমির দলিল, তারপর উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নথি। আরিফ কাগজগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। প্রতিটি তারিখ, প্রতিটি স্বাক্ষর, প্রতিটি আইনি প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে দেখতে শুরু করল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিষয়টি পরিষ্কার হতে শুরু করল।
নাসিম নিখোঁজ হওয়ার মাত্র চার মাস পর তার নামে থাকা সমস্ত সম্পত্তি আইনি প্রক্রিয়ায় রাহেলা বেগমের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। বিষয়টি কাকতালীয়ও হতে পারে, অন্তত প্রথম দৃষ্টিতে তাই মনে হয়। কিন্তু ফাইলের পরের অংশ সেই সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিল।
সেখানে সংযুক্ত ছিল একজন সাবেক ইউনিয়ন সদস্যের সাক্ষ্য। তিনি লিখিতভাবে জানিয়েছেন, নাসিম ও রাহেলা বেগমের সম্পর্ক ভালো ছিল না। সম্পত্তি নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া হতো, নাসিম বাড়ি বিক্রি করতে চাইত না কিন্তু রাহেলা বেগম চাইতেন। এ নিয়ে একাধিকবার প্রকাশ্যে তর্কও হয়েছে। কয়েকজন প্রতিবেশীও একই ধরনের তথ্য দিয়েছে। তবে তখন কেউ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। কারণ গ্রামে এমন পারিবারিক বিরোধ নতুন কিছু নয়। কয়েকদিন আলোচনা হয়, তারপর মানুষ ভুলে যায়।
আরিফ আরও সামনে এগোল। ফাইলের মাঝামাঝি অংশে একটি হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ ভাঁজ করে রাখা ছিল। কাগজটির কিনারা ছিঁড়ে গেছে, কিছু জায়গায় কালি ঝাপসা হয়ে আছে। এটি একটি চিঠি, কখনও পাঠানো হয়নি। নাসিমের হাতের লেখা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরিফ সাবধানে কাগজটি খুলল। চিঠিটি সম্ভবত তার এক বন্ধুকে লেখার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। সময়ের কারণে কিছু অংশ অস্পষ্ট হয়ে গেছে। তবু কয়েকটি লাইন এখনও পড়া যায়। সেখানে নাসিম লিখেছিল, সে নিজের জীবন নিয়ে ভয় পাচ্ছে। বাড়ির ভেতরে কী হচ্ছে, তা কাউকে বলতে পারছে না। চারপাশে এমন কিছু ঘটছে, যা তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে। আর যদি তার কিছু হয়ে যায়, তাহলে যেন বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে না নেওয়া হয়।
চিঠির শেষ লাইনটি পড়তে গিয়ে আরিফ অজান্তেই ভ্রু কুঁচকে ফেলল। “ছদ্মবেশী বন্ধু শত্রু অপেক্ষা ভয়ংকর।”
কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল সে। বাক্যটি ছোট, কিন্তু তার ভেতরে জমে আছে বছরের পর বছর ধরে চেপে রাখা ভয়, সন্দেহ আর অসহায়তা। একজন মানুষ সাধারণ অবস্থায় এমন কথা লেখে না। বিশেষ করে এমন একজন, যে নিজের জীবনের আশঙ্কা করছে।
ঘরের বাতাস হঠাৎ আরও ঠান্ডা মনে হলো। সে কিছুক্ষণ জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরে রাত অনেক গভীর হয়ে গেছে। আকাশে মেঘ জমেছে। দূরে কোথাও বিদ্যুতের মৃদু আলো ঝলসে উঠল। মুহূর্তের জন্য কয়েকটি ভবনের অবয়ব স্পষ্ট হলো, তারপর আবার সব অন্ধকারে ডুবে গেল।
আরিফ আবার ফাইলের দিকে মন দিল। এখন পর্যন্ত যা পেয়েছে, তা শুধু সন্দেহ তৈরি করে। কিন্তু সন্দেহ আর সত্য এক জিনিস নয়। একজন তদন্তকারীর কাছে অনুমান নয়, প্রমাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর তার অভিজ্ঞতা বলছিল, এই ফাইলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনও বাকি।
নতুন তদন্তে গ্রামের এক বৃদ্ধ কবিরাজের পরিবারের কাছ থেকে একটি তথ্য পাওয়া গেছে। মৃত্যুর আগে তিনি নাকি কয়েকজনকে বলেছিলেন, নাসিম নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন আগে রাহেলা বেগম তার কাছ থেকে এমন একটি বিষাক্ত ভেষজ নিয়েছিলেন, যা বেশি মাত্রায় খেলে মানুষ ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন কথাটিকে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু এখন বিষয়টি অন্যরকম মনে হচ্ছে।
প্রমাণ নেই, সরাসরি সাক্ষী নেই। আইনগতভাবে কিছুই নিশ্চিত নয়। তবু বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলো একসঙ্গে জোড়া লাগালে ছবিটা স্পষ্ট হতে শুরু করে। সম্ভবত নাসিম নিখোঁজ হয়নি কিংবা সম্ভবত সে কোথাও চলে যায়নি। সম্ভবত তার মৃত্যুর পেছনে এমন একজন মানুষ ছিল, যাকে সে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করার কথা।
আরিফ ধীরে ধীরে ফাইলের শেষ পৃষ্ঠাটি উল্টাল। সেখানে সংযুক্ত ছিল রাহেলা বেগমের মৃত্যুর ছবি। বিস্ফারিত চোখ, আতঙ্কে বিকৃত মুখ। আর মৃতদেহের পাশেই পড়ে থাকা ছোট্ট একটি কাগজ। সেখানে লেখা মাত্র একটি নাম, নাসিম।
ফাইলটি বন্ধ করে আরিফ চেয়ারে হেলান দিল। ঘড়িতে তখন রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে। বাইরে বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। দূরে কোথাও মেঘ গর্জে উঠল। টেবিলের ওপর এখন শুধু একটি ফাইল পড়ে আছে। সবচেয়ে মোটা ফাইল। সবচেয়ে বেশি মানুষ জড়িত যে ঘটনায়, শাহিন, আসিফ, করিম। আর সেই এক নাম, সাথী।
আরিফের মনে হলো, রাতের সবচেয়ে ভারী গল্পটি এখনও পড়া বাকি।
বার
আরিফ কিছুক্ষণ ফাইলটির দিকে তাকিয়ে রইল, রাত তখন অনেক গভীর। দেয়ালের ঘড়িতে বারোটার কাঁটা পেরিয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। শহরের কোলাহল অনেক আগেই স্তব্ধ হয়েছে। দূরে কোথাও মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে। জানালার কাঁচে হালকা বাতাসের ধাক্কা লাগছে, আকাশের একাংশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। মনে হচ্ছে, যে কোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে।
টেবিলের ওপর পড়ে থাকা শেষ ফাইলটির দিকে তাকিয়ে তার অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো। সারাদিনের তদন্তে এই ঘটনাটিই তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে। কারণ এখানে মৃত একজন নয়, তিনজন। আর তিনজনের মৃত্যুর পেছনে জড়িয়ে আছে একটি মাত্র নাম, সাথী।
আরিফ ধীরে ধীরে ফাইলটি খুলল। প্রথম পাতায় পাশাপাশি শাহিন, আসিফ এবং করিমের ছবি। তিনজনের বয়স ত্রিশের আশেপাশে। কোথাও বন্ধুদের সঙ্গে তোলা ছবি, কোথাও পারিবারিক ছবি, কোথাও ভ্রমণের মুহূর্ত। ছবিগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই, এই তিনজন মানুষের অতীতের ভেতর কতটা অন্ধকার লুকিয়ে আছে।
ফাইলের দ্বিতীয় অংশে ছিল তাদের মৃত্যুর বিবরণ। রাত, ব্রিজ, নদী, একটি গাড়ি আর নিয়ন্ত্রণ হারানো স্টিয়ারিং তারপর মৃত্যু। ঘটনাগুলো আরিফ আগেই পড়েছে, তদন্তের শুরু থেকেই এই অংশ তার জানা। কিন্তু এখন সে জানে, এই মামলার আসল রহস্য দুর্ঘটনায় নয়। রহস্য লুকিয়ে আছে সেই নামটির মধ্যে, যেটি মৃতদের কারও নয়।
সে পরের পৃষ্ঠা উল্টাল। প্রথমে তেমন কিছু পাওয়া গেল না। স্বাভাবিক জীবন, কলেজ, বন্ধুত্ব, ব্যবসা, চাকরি। সাধারণ কিছু তথ্য, যেগুলো দেখে মনে হয় তিনজন মানুষ স্বাভাবিক জীবনই কাটিয়েছে। কিন্তু আগের ফাইলগুলোর তাকে শিখিয়েছে, সত্য সাধারণত শুরুতেই সামনে আসে না। সেটি লুকিয়ে থাকে শেষের দিকের কোনো পুরোনো কাগজে, কোনো ভুলে যাওয়া সাক্ষ্যে কিংবা এমন কোনো ঘটনায়, যেটাকে সবাই গুরুত্বহীন ভেবে এড়িয়ে গেছে।
এরপর হঠাৎ করেই একটি পুরোনো জিডির কপি সামনে এলো। তারিখ প্রায় দশ বছর আগের, একটি নিখোঁজ ডায়েরি। নাম সাথী আক্তার, বয়স উনিশ, কলেজছাত্রী।
আরিফ একটু সোজা হয়ে বসল। এখন পর্যন্ত পাওয়া অন্য চারটি ফাইলের মতো এখানেও মৃতদের সঙ্গে চিরকুটে লেখা নামের একটি যোগসূত্র তৈরি হতে শুরু করেছে। সে আরও মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগল।
এরপরের পাতাগুলো পড়তে পড়তে তার ভ্রু ধীরে ধীরে কুঁচকে গেল। সাথী একদিন কলেজ থেকে বাসায় ফেরার পথে নিখোঁজ হয়ে যায়। প্রথম দিন সবাই ভেবেছিল কোথাও গেছে। দ্বিতীয় দিন উদ্বেগ শুরু হয়। তৃতীয় দিন পুরো পরিবার ভেঙে পড়ে। এক সপ্তাহ পর নদীর চরে তার মরদেহ পাওয়া যায়, আংশিক বালুচাপা অবস্থায়।
ফাইলের মধ্যে সংযুক্ত পুরোনো রিপোর্টটি খুলতেই আরিফের চোখ কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে গেল। ময়নাতদন্তে উল্লেখ ছিল, মৃত্যুর আগে মেয়েটি দীর্ঘ সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায় আঘাতের চিহ্ন। গলায় চাপের দাগ ছিল, মৃত্যুর আগে অসহায় প্রতিরোধেরও স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। রিপোর্টের ভাষা ছিল সংক্ষিপ্ত ও নিরাবেগ, কিন্তু সেই শব্দগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা ছিল ভয়ংকর। একটি উনিশ বছরের মেয়ের শেষ কয়েক ঘণ্টা কেমন ছিল, সেটি কল্পনা করতেও অস্বস্তি হচ্ছিল।
কিন্তু তদন্ত শেষ পর্যন্ত কোনো ফল দেয়নি। খুনি ধরা পড়েনি আর মামলাটিও ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। নতুন ঘটনা আসে, নতুন মামলা আসে, আর সাথী আক্তারের নামও একসময় মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে শুরু করে।
ফাইলের পরবর্তী অংশে ছিল নতুন তদন্তের নথি। আর সেখানেই প্রথমবারের মতো শাহিন, আসিফ ও করিমের নাম একসঙ্গে উঠে আসে। একজন সাবেক চা-দোকানির জবানবন্দি, একজন ট্রাকচালকের পুরোনো সাক্ষ্য, একটি নামবিহীন চিঠি আর কয়েকটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য। আলাদাভাবে দেখলে এগুলোর কোনো বিশেষ অর্থ দাঁড়ায় না। কিন্তু সবকিছু একসঙ্গে রাখলে অন্য একটি ছবি তৈরি হতে শুরু করে।
সাথী নিখোঁজ হওয়ার রাতে শেষবার তাকে একটি কালো মাইক্রোবাসের কাছে দেখা গিয়েছিল। তদন্তে পরে জানা যায়, সেই মাইক্রোবাসটি ছিল করিমের। আরও কয়েকটি সাক্ষ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, সেদিন রাতে শাহিন, আসিফ ও করিম একসঙ্গেই ছিল।
আরিফের বুকের ভেতর একটা চাপা অস্বস্তি তৈরি হলেও সে পড়তে থাকল। একজন প্রত্যক্ষদর্শী নাকি বহু বছর আগে পুলিশের কাছে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু পরদিনই হঠাৎ করে নিজের বক্তব্য বদলে ফেলে। একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা অস্বাভাবিকভাবে বদলি হয়ে যায়। মামলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামত রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যায়। কিছু সাক্ষীও পরে আর মুখ খুলতে রাজি হয়নি। যেন ক্ষমতাবান কারো চাপ ধীরে ধীরে পুরো তদন্তকে ভেতর থেকে নিস্তেজ করে দিয়েছিল। আর তারপর শুরু হয় নীরবতা, পুরো দশ বছরের নীরবতা।
এমন এক নীরবতা, যার ভেতরে চাপা পড়ে ছিল একটি মেয়ের মৃত্যু, কয়েকজন মানুষের ভয় এবং হয়তো এমন কিছু নাম, যেগুলো কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার সঙ্গে যুক্তই হয়নি। মনে হচ্ছিল, কেউ ইচ্ছে করে পুরো ঘটনাটিকে মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিল, যাতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু হারিয়ে যায়।
ফাইলের শেষ অংশে পৌঁছে আরিফের দৃষ্টি ধীরে ধীরে স্থির হয়ে গেল। সেখানে একটি তথ্য সংযুক্ত ছিল।
সাথীর ব্যক্তিগত ডায়েরির একটি পৃষ্ঠা, যেটি তার পরিবারের কাছে বহু বছর পরে পাওয়া যায়। পাতাটি আংশিক নষ্ট, তবু কিছু লেখা এখনও পড়া যায়। মেয়েটি লিখেছিল, কয়েকদিন ধরে কিছু লোক তাকে অনুসরণ করছে। তাদের মধ্যে একজনকে সে চিনেছে, কিন্তু নাম লেখেনি। কেন লেখেনি, সেটাও আর কখনও জানা যাবে না। হয়তো ভয় পেয়েছিল, হয়তো ভেবেছিল পরিস্থিতি নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে।
শেষ লাইনে শুধু একটি বাক্য ছিল, “পশু সহজেই চেনা যায়, কিন্তু মানুষরূপি পশুরা তো মানুষের মতোই দেখতে, তাই আলাদা করা সহজ না।”
আরিফ ধীরে ধীরে ডায়েরির কপিটি নামিয়ে রাখল। ঘরের ভেতর তখন এমন নীরবতা, যেন পৃথিবীর সব শব্দ কোথাও হারিয়ে গেছে। সে আবার প্রথম পৃষ্ঠার দিকে তাকাল, শাহিন, আসিফ এবং করিম। তিনটি মুখ, তিনজন মানুষ, যাদের জীবন বাইরে থেকে স্বাভাবিক, সফল এবং সম্মানজনক বলেই মনে হতো। তারপর টেবিলের পাশে রাখা চিরকুটের ছবির দিকে তাকাল, সেখানে লেখা একটি নাম, সাথী।
তের
হঠাৎ তার মনে হলো, এই পাঁচটি ঘটনার মধ্যে এটিই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ এখানে লোভ ছিল না, সম্পত্তি ছিল না, ব্যবসা ছিল না, ছিল কেবল ক্ষমতার উন্মাদনা। একটি অসহায় জীবনের ওপর তিনজন মানুষের নির্মম অত্যাচার। আর সেই অপরাধ প্রায় দশ বছর ধরে অন্ধকারে চাপা পড়ে ছিল। যারা বিচার পাওয়ার কথা ছিল, তারা বিচার পায়নি। যারা শাস্তি পাওয়ার কথা ছিল, তারা বছরের পর বছর স্বাভাবিক জীবন কাটিয়েছে।
বাইরে আচমকা বিদ্যুৎ চমকালো, মুহূর্তের জন্য পুরো ঘর সাদা আলোয় ভরে উঠল। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা ফাইলগুলো, জানালার কাঁচ, আরিফের ক্লান্ত মুখ, সবকিছু এক ঝলকের জন্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। তারপর আবার অন্ধকার, কয়েক সেকেন্ড পর দূরে কোথাও মেঘ গর্জে উঠল।
ঘড়ির কাঁটা তখন রাত একটা পেরিয়েছে। বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু ছাদ থেকে এখনও ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। সারাদিনের ক্লান্তি শরীরকে ভারী করে তুলেছে, অথচ তার চোখে ঘুম নেই। পাঁচটি ফাইলের প্রতিটি পাতা যেন এখনও তার মাথার ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে, শরিফ, সাথী, নাসিম, হেলাল আর সাবিহা।
সে চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দূরের শহর প্রায় নিস্তব্ধ, মাঝেমধ্যে কোনো গাড়ির আলো অন্ধকার কেটে চলে যাচ্ছে। আকাশে এখনও মেঘ জমে আছে, আবার বৃষ্টি নেমেছে। মনে হচ্ছে, রাত এখনও শেষ হয়নি। বরং যত সময় যাচ্ছে, রাত যেন আরও গভীর হয়ে উঠছে। ঘর আবার অন্ধকারে ডুবে গেল। জানালার বাইরে বাতাসের গতি বেড়ে গেছে। ভেজা কাঁচে বৃষ্টির শেষ ফোঁটাগুলো গড়িয়ে পড়ছে। কয়েক সেকেন্ড পর আরিফ কাঁপা হাতে কাগজটি তুলে নিল। ধীরে ধীরে ভাঁজ খুলল। তারপর স্থির হয়ে রইল, বাইরে আবার বাতাস বইতে শুরু করেছে। জানালার কাঁচ কাঁপছে, দূরে কোথাও বজ্র গর্জে উঠল। আর টেবিলের ওপর খোলা পাঁচটি ফাইলের পাশে পড়ে থাকা ছোট্ট কাগজটির দিকে তাকিয়ে তার মুখের সমস্ত রক্ত যেন সরে গেল। কাগজটিতে একটি মাত্র নাম লেখা ছিল, “সাইফুল”!
হঠাৎ তার মনে হলো সামনে কেউ দাঁড়ানো, কিন্তু আবার এক ঝলকই উবে গেল। আরিফ চারিদিকে তাকালো, কিন্তু কেউ নেই সেখানে, ড্রয়িংরুম ফাঁকা। যেন কয়েক মুহূর্ত আগেও সেখানে কেউ ছিলই না। আরিফের শ্বাস ভারী হয়ে উঠল, সে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। রান্নাঘর, বারান্দা, করিডোর, কোথাও কেউ নেই। অথচ কয়েক মুহূর্ত আগেও সে সাইফুলকেই নিজের চোখে দেখেছে।
ঠিক তখনই তার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। নিঃশব্দ ঘরের মধ্যে শব্দটা এত হঠাৎ শোনাল যে সে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল থানার ডিউটি অফিসারের নাম। কাঁপা হাতে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আতঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে এলো।
“স্যার… একটা খারাপ খবর আছে।”
আরিফ কিছু বলল না। তাই সে আবার বলতে থাকলো,
“সাইফুল স্যার… আজ রাত সাড়ে বারোটার দিকে মারা গেছেন।”
আরিফের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। ওপাশের কণ্ঠস্বর বলে চলল, “হাসপাতাল থেকে খবর এসেছে, বাসায় হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়। আমরা এখনই খবর পেলাম…”
বাকিটা আরিফের কানে ঢুকল না। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর পড়ে থাকা কাগজটির দিকে চলে গেল, যেখানে লিখা সাইফুল। ঘড়ির দিকে তাকাল সে, রাত একটা সাত মিনিট। অর্থাৎ যখন সে সাইফুলকে নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে, তার আগেই সাইফুল মারা গেছে।
বাইরে প্রচণ্ড শব্দে বজ্রপাত হলো, ঘরের সব আলো একবার মিটমিট করে উঠল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে টেবিলের ওপর রাখা পাঁচটি ফাইলের মাঝখান থেকে বাতাসের ঝাপটায় একটি আলগা কাগজ উড়ে মেঝেতে পড়ে গেল, কাঁপা হাতে সেটি তুলে নিল আরিফ। সাইফুল লিখা কাগজটির পেছনে আগে চোখ যায়নি। সেখানে ছোট ছোট অক্ষরে একটি মাত্র লাইন লেখা, “হিসাব এখনও শেষ হয়নি”।
আরিফের বুকের ভেতরটা যেন জমে গেল। ধীরে ধীরে সে মাথা তুলল, তারপর স্থির হয়ে রইল। ড্রয়িংরুমের বড় জানালার ওপারে, বৃষ্টিভেজা অন্ধকারের মধ্যে কয়েকটি অস্পষ্ট অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে সে ভাবল, হয়তো চোখের ভুল। কিন্তু পরের বিদ্যুতের ঝলকে অবয়বগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল, শরিফ, সাবিহা, হেলাল, নাসিম, সাথী আর সাইফুল।
তারা কেউ নড়ছিল না। শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। তাদের মুখে রাগ নেই, ক্রোধ নেই, প্রতিশোধের উন্মাদনাও নেই, আছে কেবল এক অদ্ভুত নীরবতা। এমন নীরবতা, যা মানুষের বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ভয় হয়ে জন্ম নেয়।
আর তাদের ঠিক মাঝখানে একটি খালি জায়গা দেখা যাচ্ছিল। যেন সেখানে আরও কারও দাঁড়ানোর কথা। যেন তারা কারও জন্য অপেক্ষা করছে।বাইরে আবার বিদ্যুৎ চমকালো। এক মুহূর্তের জন্য সাদা আলোয় সবকিছু স্পষ্ট হয়ে উঠল। তারপর পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে গেল। আর সেই রাতের পর পুলিশ অফিসার আরিফ হোসেনকে আর কখনও দেখা যায়নি। কয়েক দিন পর তার ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুম থেকে উদ্ধার করা হয় খোলা পাঁচটি ফাইল, একটি উল্টে থাকা চেয়ার, আর টেবিলের ওপর পড়ে থাকা একটি ছোট্ট কাগজ। সেখানে লেখা ছিল মাত্র একটি নাম, “আরিফ”। আর সাথে একটা ছবি, পাশাপাশি দুজন, না শুধুই একজনের দুইটা ছবি সেটা বোঝা যাচ্ছে না। ছবিতে আরিফ আর তার জমজ ভাই জারিফ…
সমাপ্ত
