
বিবেকসম্পন্ন মানুষ
মোঃ মিসাদ আলী
রাজপথে মিছিল বের হয়েছে। শত শত নারীর সঙ্গে আজ কিছু পুরুষও যোগ দিয়েছে সেই মিছিলে। সবার চোখে-মুখে এক ধরনের উদ্দীপনা, যেন যুগের বাঁক বদলের ঠিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে তারা। মুখের ফেনা তুলে নিজেদের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে সবাই। তাদের একটাই দাবি, তাদের একটাই চাওয়া, “নারী-পুরুষের সমান অধিকার”।
নারীদের সঙ্গে যেসব পুরুষ এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছে, তাদেরকে নারীরা একটি নাম দিয়েছে, “বিবেকসম্পন্ন মানুষ”। তাদের চোখে এই পুরুষরাই যুগ-সংঘাতের প্রকৃত সহযাত্রী। আর যারা এই আন্দোলনের বিরোধিতা করছে, যারাই বলেছে নারী-পুরুষ সমান না, তাদেরও দেওয়া হয়েছে আরেকটি নাম, “বিবেকহীন মানুষ”। মাঝেমধ্যে মিছিলের ভেতর থেকে ভেসে আসছে ছোটবেলায় পড়া সেই চরণ, “বিবেকহীন মানুষ পশুর সমতুল্য।”
আজ তারা মুক্তি চায় গৃহের বন্ধন থেকে। সেই চার দেয়ালের ভেতর বন্দী জীবন থেকে, যেখানে কাজের কোনো শেষ নেই, মুক্তি চায় স্বামীর অত্যাচার থেকে, এমন অত্যাচার, যা হয়তো বাহ্যিকভাবে সহনীয়, কিন্তু মানসিকভাবে ধারালো ছুরির মতো প্রতিনিয়ত ক্ষত সৃষ্টি করে। সারাদিনের কাজের পর যখন প্রিয় টিভি সিরিয়াল দেখার সময় হয়, তখন স্বামী বলে,
-“একটু চা এনে দাও।”
এ কেমন অত্যাচার! পুরুষেরা তাদের হাতের পুতুলের মতো নাচাচ্ছে। এভাবে আর কতদিন? আর কত বাধা সহ্য করবে তারা? এবার সময় এসেছে নিজের অধিকার বুঝে নেওয়ার। তাদের উৎসাহ দিতে এগিয়ে এসেছে কিছু “বিবেকসম্পন্ন মানুষ”। এগিয়ে এসেছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলও। তারা দিকনির্দেশনা দিচ্ছে, প্রচার করছে, সমর্থন জানাচ্ছে। তাদের দাবি, এভাবেই গড়ে উঠবে নতুন, উন্নত ও আধুনিক বাংলাদেশ, যা বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে বলার মতো একটা ঘটনা হবে।
মেয়েরা কেন নিজেদের পছন্দমতো পোশাক পরে রাস্তায় বের হতে পারবে না? জীবন তো তাদের নিজেদেরই, তাই তারা যা ইচ্ছা করবে, যা ইচ্ছা পরবে। এতে বাধা দিতে কেন এগিয়ে আসবে তথাকথিত “বিবেকহীন মানুষ”?
তাদের মতে, এই মানুষগুলো আসলে নারীর সৌন্দর্যকে হিংসা করে। নিজেরা সুন্দর নয় বলেই নারীদের সৌন্দর্যকে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রাখতে চায়। তারা স্বাধীন নারীকে ভয় পায়, ভয় পায় নারীর চোখে চোখ রেখে কথা বলাকে। ভয় পায় কারণ তাদের পদচারণায় কেঁপে উঠবে নিজেদের গড়ে তোলা সংকীর্ণতার প্রাচীর।
অনেকক্ষণ ধরে দূরে দাঁড়িয়ে মিছিলটি লক্ষ্য করছিল নাশিদ। সে কোনো পক্ষের নয়, নিরপেক্ষ এক পর্যবেক্ষক, এই বিষয়টা তার এখনও পুরোপুরি বোধগম্য হয়ে উঠেনি। মনে এখনও অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম হয়, উঁকি দেয়, তবে উত্তর সে খুঁজে পায় না।
ঠিক তখনই কাগজ হাতে কয়েকজন যুবককে হেঁটে যেতে দেখে একজনকে ডাক দিল সে।
-“আরে সাইফ, কোথায় যাচ্ছিস?”
– “দেখছিস না মিছিল হচ্ছে? সেখানেই যাচ্ছি। তুই এখানে দাঁড়িয়ে কী করছিস? তুইও চল।”
-“ওটা তো নারীদের আন্দোলন। তুই সেখানে গিয়ে কী করবি? তাছাড়া তাদের এসব অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে তোর কী লাভ?”
সাইফ হালকা হেসে বলল,
-“ওসব বুঝোস না ব্যাডা? মাইয়ারা যদি রাস্তায় খোলামেলা ভাবে ঘুরে, লাভ তো আমগোরই। একবার ভাব, নারীরা সমান অধিকার পাইলে কত শত মাইয়া দেখতে পাবি ফ্রিতে। এমনি তো পর্দার আড়ালে যুবতী আর বৃদ্ধা চেনাই যায় না। তাছাড়া তাদের লগে থাকলে দুই-একটা মাইয়ারে পটাইতেও পারি, লাভ তো আছেই। সমান অধিকারের পাশাপাশি তো তারা পোশাকের স্বাধীনতাও চায়, এটা তো বড় একটা কারণ তাদের সমর্থন করার। তুই শুধু শুধু সময় নষ্ট না করে চল আমাদের সাথে, তোর জন্যও একটা ব্যবস্থা করে দিবো সুন্দরী শাহবাগী মেয়ে।”
-“ছি! তোর চিন্তাধারা এত নিচু!” চোখে বিরক্তি আর বিস্ময়ের ছায়া নিয়ে বললো নাশিদ। তার কথা শুনে সাইফ ঠোঁট বাঁকিয়ে আরও একটু হাসল তারপর বললো..,
-“এখানে নিচুর কী দেখলি? ওখানে যত পোলা আছে, তাদের অনেকের চিন্তা আরও খারাপ। নারীদের সৌন্দর্য এখন পণ্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। বিভিন্ন বিজ্ঞাপন কোম্পানি আর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি সেই সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করছে। পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারীকে রাখলে বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আমরা তো শুধু সেই ব্যবস্থার বাইপ্রোডাক্ট দেখতেছি। এগুলোর সাথে আরও অনেক বিষয় আছে, সেগুলো তোর কল্পনারও বাইরে।”
-“তাহলে নারীরা নিজেদের ভালো না বুঝে এভাবে কেন হায়েনাদের হাতে নিজেদের সঁপে দিচ্ছে?” চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞাসা করে নাশিদ, সাইফ যেন এই প্রশ্নের অপেক্ষাতেই ছিল। মুখে একটি বক্র হাসি এনে বলল,
-“কারণ তাদের মাথার ভেতর কিলবিল করছে ‘সম অধিকার’ নামের পোকা।”
কথা শেষ করে হাসতে হাসতে মিছিলের দিকে এগিয়ে গেল সাইফ। আর নাশিদ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চারদিকে তখনও স্লোগান, ক্যামেরার ঝলকানি, মাইক্রোফোন আর মানুষের উচ্ছ্বাস। বাতাসে উড়ছে ব্যানার, পতাকা, নানা রঙের পোস্টার। প্রত্যেকেই বিশ্বাস করছে, তারা ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায় লিখছে। অথচ এই বিপুল কোলাহলের মাঝেও নাশিদের মনে হচ্ছিল, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যেন কেউ করছে না। “সম অধিকার” বলতে আসলে কী বোঝায়? আর কোনটা বেশি জরুরি সম অধিকার নাকি নায্য অধিকার!
সমাপ্ত…
লেখা: ০১.১০.২০২১
